ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের দল ঘোষণার পর বাংলাদেশের ওপেনিং পজিশন নিয়ে আলোচনাটা নতুন করে সামনে এসেছে। ১৫ সদস্যের দলে স্বীকৃত ওপেনার হিসেবে জায়গা পেয়েছেন কেবল তানজিদ হাসান ও সাদমান ইসলাম। জাতীয় দলের দরজা আপাতত বন্ধ থাকলেও বিকল্প হিসেবে আলোচনায় থাকা অন্য ওপেনাররা যে নিজেদের সামর্থ্য জানান দিতে প্রস্তুত, জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) চতুর্থ রাউন্ডে তারই যেন মহড়া দিলেন মোহাম্মদ নাঈম শেখ ও মাহফিজুল ইসলাম রবিন।
আজ রোববার একই দিনে দুই ভেন্যুতে দুই ওপেনারের ব্যাট থেকে এসেছে দুটি বিশাল ইনিংস। রাজশাহীতে নাঈমের ব্যাট থেমেছে ২৮২ রানে। ট্রিপল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। অন্যদিকে বগুড়ায় মাহফিজুল ইনিংস শেষ করেছেন ২১৭ রানে অপরাজিত থেকে। দুজনের এমন ব্যাটিংয়ে জাতীয় দলের বিকল্প ওপেনার খোঁজার আলোচনাও পেয়েছে নতুন মাত্রা!
রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ঢাকা বিভাগের হয়ে ব্যাট হাতে রীতিমতো দাপট দেখিয়েছেন নাঈম। প্রথম দিন শেষে ১৭১ রানে অপরাজিত থাকা এই ব্যাটসম্যান দ্বিতীয় দিনেও এগিয়েছেন একই ছন্দে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এর আগে তার সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ১৮০ রানের। এবার সেই রেকর্ডকে অনেক পেছনে ফেলে পৌঁছে যান ২৮২-তে।
ট্রিপল সেঞ্চুরির স্বপ্নটাও তখন আর খুব দূরের মনে হচ্ছিল না। কিন্তু স্পিনার রহিম আহমেদের বলে ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে গিয়ে কাভারে ক্যাচ দিয়ে থামতে হয় তাকে। ৩৬৯ বলের ইনিংসে ২১টি চার ও ৭টি ছক্কা মেরেছেন নাঈম। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের নতুন সর্বোচ্চ রানের ইনিংস গড়ার পাশাপাশি চলতি লিগেও ছুটছেন দুর্দান্ত গতিতে। ছয় ইনিংসে দুই সেঞ্চুরি ও একটি ডাবল সেঞ্চুরিতে তার সংগ্রহ এখন ৫৬১ রান।
নাঈমের ২৮২-কে অবশ্য কিছুটা ছাপিয়ে গেছে মাহফিজুলের ধারাবাহিকতার গল্প। বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে চট্টগ্রাম বিভাগের বিপক্ষে ময়মনসিংহের হয়ে খেলতে নেমে প্রথম দিন শেষ করেছিলেন ১৫৬ রানে অপরাজিত থেকে। দ্বিতীয় দিনেও বড় ইনিংসের পথে কোনো তাড়াহুড়া করেননি ২২ বছর বয়সী এই ওপেনার। বরং ধৈর্য ধরে এগিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির দিকে।
প্রথম সেশনে ৬২ বলে যোগ করেন মাত্র ১৯ রান। বিরতির পরও ঝুঁকি এড়িয়ে ব্যাটিং চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ৩৩৮ বলে প্রথমবারের মতো দ্বিশতকের দেখা পান তিনি। এরপরও থামেননি। ইনিংসের দ্বিতীয় ছক্কাটি মেরে পৌঁছে যান ২১৭ রানে। ৩৫১ বলের ইনিংসে চার ছিল ২০টি, ছক্কা দুটি। ময়মনসিংহ ৭ উইকেটে ৪৬৫ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করলে অপরাজিতই থাকতে হয় তাকে।
এই ইনিংসটি শুধু একটি ডাবল সেঞ্চুরির গল্প নয়, মাহফিজুলের চলতি মৌসুমের অবিশ্বাস্য উন্নতিরও প্রতিচ্ছবি। এবারের জাতীয় ক্রিকেট লিগে সাত ইনিংসে এটি তার তৃতীয় সেঞ্চুরি। বাকি চার ইনিংসের দুটিতে করেছেন ৬০ পেরোনো রান। সব মিলিয়ে ১০২.৮৩ গড়ে তার সংগ্রহ ৬১৭ রান। চলতি আসরে ৬০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়া প্রথম ব্যাটসম্যানও তিনি।
অথচ মৌসুম শুরুর আগে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৪ ম্যাচের ২৬ ইনিংসে তার সংগ্রহ ছিল মাত্র ৪৭৩ রান। গড় ১৮.৯২। সেখানে একটি সেঞ্চুরি ও একটি ফিফটি ছিল তার সঙ্গী। এবার মাত্র চার ম্যাচ ও সাত ইনিংসেই আগের ১৪ ম্যাচের মোট রানকে ছাড়িয়ে গেছেন এই তরুণ। বগুড়ার ইনিংসেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পূর্ণ করেছেন এক হাজার রান। চার সেঞ্চুরিতে ক্যারিয়ার গড়ও উঠে গেছে ৩৫-এর ওপরে!
মাহফিজুলের এই উত্থান অবশ্য এক দিনের নয়। প্রথম রাউন্ডে ৭০ রানের ইনিংস দিয়ে শুরু। পরের ইনিংসেই সেঞ্চুরি। দ্বিতীয় রাউন্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৮ রান করার পর তৃতীয় রাউন্ডে ঢাকার বিপক্ষে খেলেন ১১৬ রানের ইনিংস। এবার সেই ধারাবাহিকতাকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়।
মজার ব্যাপার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের জন্য ঘোষিত ১৫ সদস্যের দলে জায়গা না পেলেও ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে বিসিবি একাদশের হয়ে খেলেছিলেন মাহফিজুল। সেখানে অবশ্য ৮ বলে ৪ রান করেই ফিরতে হয়েছিল তাকে। প্রস্তুতি ম্যাচের সেই ব্যর্থতার পর জাতীয় লিগে এমন প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে তার।
প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার আগেই জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলের দুই ওপেনার তানজিদ ও সাদমানের বাইরে অন্য সম্ভাব্যদের জাতীয় ক্রিকেট লিগে দেখে নিতে চান তারা। চতুর্থ রাউন্ডে নাঈম ও মাহফিজুল যেন সেই পরীক্ষায় নিজেদের পক্ষেই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি তুলে ধরলেন। দুজনের ইনিংসের ধরন অবশ্য আলাদা। নাঈম দেখিয়েছেন বড় ইনিংসকে কীভাবে বিস্ফোরক রূপ দেওয়া যায়, আর মাহফিজুল দেখিয়েছেন ধৈর্য ও ধারাবাহিকতায় কীভাবে দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকা যায়। জাতীয় দলের দরজা খুলবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নির্বাচকদের।
