আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবলই ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা শাসনের রদবদলের কোনো গতানুগতিক আখ্যান নয়; এটি হলো একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার নিরন্তর ত্যাগের সংকলন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। এই নবতর যাত্রাপথে যে রাষ্ট্রদর্শন জাতীয় ঐক্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তা হলো- ‘ধর্ম যার যার, নাগরিক অধিকার সবার’।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ভূখণ্ডের বিস্তৃতি, অর্থনীতির আকার কিংবা সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই রাষ্ট্র কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে তার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য, তার ওপরই নির্ভর করে রাষ্ট্রের সভ্যতা, গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা। সংখ্যাগরিষ্ঠের পাশাপাশি সংখ্যালঘুরাও যখন সমান নিশ্চয়তায় নিজেদের নাগরিক হিসেবে ভাবতে পারেন, ধর্মীয় পরিচয় যখন নাগরিক অধিকার প্রাপ্তির মাপকাঠি হয়ে ওঠে না এবং উন্নয়নের সুফল যখন সমাজের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তখনই একটি রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ধর্মের ভিত্তিতে নয়, নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার’ বক্তব্য তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চরিত্র নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিচালনায় বাংলাদেশ আজ যে নতুন দিকনির্দেশনার মুখোমুখি, সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি মূল স্তম্ভ সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ধর্ম, বর্ণ বা গোষ্ঠী নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষের সংবিধানসম্মত সম-অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করে টেকসই, সবুজ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন। সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকা-১৭ আসনের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তারেক রহমান বলেছেন, সরকার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে চায় না; প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আটটি মন্দিরের প্রতিনিধিরা তাকে পূজার আমন্ত্রণ জানান। এ সময় তারা পূজার ছুটি ও অনুদান বাড়ানোর জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। বৈঠকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন এবং সরকারের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানান। গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন ও বারিধারা ডিওএইচ পূজা কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ প্রতিনিধিদলের এই সাক্ষাৎ এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে ফিরে আসা শান্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি প্রমাণ করে যে, এই নীতি কেবল মুখরোচক স্লোগানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রশাসনিক অনুশীলনে পরিণত হয়েছে।
এই মতবিনিময়ের তাৎপর্য কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারপ্রধানের সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, সম্পত্তির অধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমঅধিকারের বার্তা দেওয়া যেমন ইতিবাচক, তেমনি সেই বার্তাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত করাও অপরিহার্য। তবে কোনো সম্প্রদায়ের কয়েকজন নেতার সন্তোষ প্রকাশ অবশ্যই ইতিবাচক সংকেত; কিন্তু তা দিয়ে সমগ্র দেশের সব মানুষের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। সরকারের সাফল্য বিচার করতে হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, অভিযোগের তদন্ত, অপরাধের বিচার এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের পরিচয় হলো-সেখানে কোনো নাগরিককে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন করতে হয় না; রাষ্ট্রই তাঁর অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।
তারেক রহমানের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষ সম্মিলিতভাবে অংশ নিয়েছেন। এই ইতিহাসের অন্তর্নিহিত শিক্ষা স্পষ্ট—বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একক অর্জন নয়। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্বও তাই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজিত হতে পারে না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গে এই উপলব্ধি গভীরভাবে সম্পর্কিত। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল রাজনৈতিক মুক্তি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠা। সংবিধানও ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মসহ বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিকের সমমর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো সরকারের ঐচ্ছিক সদিচ্ছার বিষয়মাত্র নয়; এটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
তারেক রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু নেতাকর্মীদেরও নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের অভিযোগ আলোচিত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ হলো, কোনো একটি দলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার করা। অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অন্যায় প্রতিরোধ-দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে তখনই, যখন ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে নিপীড়নের চরিত্র বদলাবে না; বরং নিপীড়নের সংস্কৃতিই বিলুপ্ত হবে।
এই কারণেই ‘ধর্ম যার যার, নাগরিক অধিকার সবার’ বক্তব্যটি একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল উৎসবের সময় শুভেচ্ছা বিনিময় কিংবা উপাসনালয়ে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিক্ষায় সমান সুযোগ, কর্মসংস্থানে বৈষম্যহীনতা, সরকারি সেবা গ্রহণে সমতা, প্রশাসনে ন্যায্য আচরণ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বাধীন অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। একজন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা অন্য ধর্মীয় পরিচয়ের নাগরিক যেন তার যোগ্যতা, শ্রম ও মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান-এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি। তবে রাষ্ট্রদর্শনের প্রকৃত পরীক্ষা বক্তব্যের সৌন্দর্যে নয়, বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায়। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় কিংবা সম্পত্তি আক্রান্ত হলে দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে হুমকি, হয়রানি বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ, গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পেশাদার, সংযত ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে সরকারের পররাষ্ট্র ও উন্নয়ন নীতিতে। কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশ আজ আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে কেবল সহায়তা প্রার্থনাকারী হিসেবে দাঁড়াতে চায় না, বরং সমতা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। বৈঠকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, কারিগরি শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং জলবায়ু অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কানাডার কৌশলগত সহযোগিতা আহ্বান করা হয়েছে। এর জবাবে কানাডা কর্তৃক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, নার্সিং প্রশিক্ষণ এবং কৃষি ক্ষেত্রে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ এটাই প্রমাণ করে যে, বিশ্বসমাজ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ রূপকল্পের ওপর আস্থা স্থাপন করছে। তবে কূটনৈতিক বৈঠকে আগ্রহ প্রকাশ আর মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। প্রয়োজন নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, অর্থায়নের স্বচ্ছতা, সময়সীমা এবং ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা।
জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা, আমদানিনির্ভরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাংলাদেশের শিল্প ও পরিবহন খাতকে প্রভাবিত করে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং দেশীয় সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমতা ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের মূল ভিত্তি নির্ভর করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ঐতিহ্যগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ও তথ্যের ভিত্তিতে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহারে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী জোরদার করা। ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের সঠিক ডেটাবেজ তৈরি এবং তাদের কাছে সরাসরি কৃষি উপকরণ ও সরকারি প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে। তবে ডিজিটাল ব্যবস্থায় ভুল তথ্য, বাদ পড়া কৃষক, মধ্যস্বত্বভোগীর হস্তক্ষেপ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এর পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’-সহ অন্যান্য সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে সঠিকভাবে সমন্বিত ও স্বচ্ছ করতে পারলে দেশের অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে স্থায়ীভাবে বের করে আনা সম্ভব হবে। তবে দারিদ্র্য থেকে স্থায়ী মুক্তির জন্য নগদ সহায়তার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার হতে হবে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য মানদণ্ডভিত্তিক। তাহলেই রাষ্ট্রের সহায়তা রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময় নয়, নাগরিকের ন্যায্য প্রাপ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট জলবায়ু পরিবর্তন, যার নির্মম শিকার বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশ এখন কেবল বিশ্বমঞ্চে অনুযোগ জানানোর জায়গায় সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বৈঠকে উপস্থাপিত সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন প্রকল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সার্বিক প্রসার কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্যই রক্ষা করবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। নদী-খাল পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা হ্রাস, কৃষিজমিতে পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে এসব কর্মসূচির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। তবে বৃক্ষরোপণের সাফল্য কেবল কতটি চারা লাগানো হলো, সেই হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না; কতটি গাছ টিকে থাকল, কোথায় লাগানো হলো এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর কী প্রভাব পড়ল, সেসবও মূল্যায়ন করতে হবে। কানাডা সরকার বিশ্বজুড়ে জলবায়ু অর্থায়নে আগামী পাঁচ বছরে ১৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার ব্যয়ের যে ঘোষণা দিয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো পরিবেশবান্ধব রূপকল্পের দেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে এই আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রকল্প প্রণয়ন, কারিগরি সক্ষমতা, জবাবদিহি এবং অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু অর্থায়ন যেন শুধু নীতিপত্র ও সম্মেলনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং উপকূলের কৃষক, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে।
অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ এক বিশাল বোঝা বহন করছে। মায়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে যে মানবতাবোধের অনন্য নজির স্থাপন করেছে, তা সর্বজনবিদিত। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় জনজীবন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের অংশ। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, যার সঙ্গে কানাডীয় প্রতিনিধিদলও পূর্ণ একমত প্রকাশ করেছে। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং আশ্রয়শিবিরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক সেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা জরুরি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে কার্যকর ফলাফলে রূপান্তর করাই হবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার অন্যতম পরীক্ষা।
পরিশেষে বলা যায় যে, কোনো রাষ্ট্রের সক্ষমতা কেবল তার জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বাহ্যিক অবকাঠামোর চটকদার দৃশ্যে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য নিহিত থাকে তার সবচেয়ে দুর্বল ও সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তাবোধের মধ্যে, প্রান্তিক কৃষকের মুখে হাসিতে এবং বিশ্বমঞ্চে স্বকীয় মর্যাদায় দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার আদায় করে নেওয়ার শক্তিতে। আজ তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে নতুন রাষ্ট্রদর্শনের ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে, তা একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সর্বজনীন সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলছে, অন্যদিকে তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখাচ্ছে। সামাজিক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় সাম্যের এই যুগপৎ অভিযাত্রা বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে এক মানবিক, আত্মনির্ভরশীল ও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিরস্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করবে। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং সমালোচনার সুযোগকে উন্নতির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে সুসংহত করে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
