শাহানা হুদা রঞ্জনা
বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মানুষের মুখে এখন একটাই কথা, আর পারছি না। অসংখ্য মানুষকে সংসার চালাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই খাওয়া বলতে শুধু ডাল-ভাত বুঝিয়েছি, আমিষ বাদ পড়েছে বহু আগেই। ভাত, ডাল, রুটি ও সবজি জোগাড় করতেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এর পাশাপাশি আছে সন্তানের পড়াশোনার খরচ, পরিবহন, বাসাভাড়া, ওষুধ, বাবা-মায়ের চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলসহ আরও অনেক কিছু।
এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক বলছে, বড়সড় একটি অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই নাকি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া ও জ্বালানি সংকটের বাড়তি চাপে আছে মানুষ। এতে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন উল্টো পথে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক (‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদন)।
বিশ্বব্যাংক ‘বড়সড় ধাক্কার’ আশঙ্কা করলেও দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে, ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক সংকটে তারা দরিদ্র হতে চলেছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২.৫ শতাংশে উঠতে পারে।
শুধু দরিদ্র নয়, দেশে চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে বড় কারণ গত চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর কমেছে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা। তীব্র জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়া, কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, বিনিয়োগ না থাকা—এমন একটা পরিস্থিতিতে জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের পক্ষে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা খুবই কম।
গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। পাশাপাশি সরকারি কর ও সহায়তা ব্যবস্থার অধীনে দরিদ্র মানুষকে যতা সুরক্ষা দেওয়ার কথা, বাস্তবে তা দেওয়া হচ্ছে না।
একদিকে সরকার দরিদ্র মানুষকে যেটুকু সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন পরোক্ষ করের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে সেই সহায়তার চেয়েও বেশি অর্থ তুলে নিচ্ছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারের কাছ থেকে যতা পাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করছে।
খবরে দেখলাম, রংপুরে ওএমএসের মাধ্যমে চাল ও আটা বিক্রিকে কেন্দ্র করে হাহাকার, লাইনে হাতাহাতি ও কাড়াকাড়ির ঘটনা ঘটেছে। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে চাল-আটা না পেয়ে ফিরে গেছেন। এই ঘটনা এখন খুব একটা অপরিচিত নয়। ওএমএসের ট্রাকের পেছনে ভিড় বাড়ছে। খোলাবাজারের তুলনায় ওএমএসের পণ্যের দাম অনেক কম হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কেন এসব মানুষ মারামারি করে হলেও চাল-আটা কেনার জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন? এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি পড়ে। চালের দাম বাড়লে সচ্ছল মানুষের অসুবিধা হয় না, কারণ তাদের আয়ের খুব সামান্য অংশ চালের পেছনে যায়। কিন্তু নিম্নবিত্তের আয়ের বড় অংশ যায় খাদ্য কিনতে।
লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যার তুলনায় ডিলারদের কাছে প্রতিদিনের চাল ও আটার বরাদ্দ সীমিত। ফলে লাইন শেষ হওয়ার আগেই পণ্য ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর এ জন্যই হইচই ও গোলযোগ। সাধারণ মানুষের চাহিদার কথা ভেবে সরকারের উচিত ওএমএসের ট্রাকে পণ্যের জোগান বাড়ানো। কারণ সাধারণ মানুষের চাল, ডাল ও আটা কেনার এটাই জায়গা।
সালমা খাতুনের সঙ্গে কথা হলো একজনের বাসায়। সালমার সংসারটি এখন চরম সংকটের মুখে। তিনি কাজ করতেন একটি পোশাক তৈরির কারখানায়। সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ নিয়েছেন গৃহকর্মীর। আয় কমে হয়েছে অর্ধেক।
সালমা খাতুন এখানে একটি উদাহরণ। অনেক পরিবারেরই এখন এই অবস্থা। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বাড়ছে দুর্ভোগ ও অসন্তোষ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে তাদের দৈনিক খাদ্যতালিকা অনেক ছোট করছে।
সরকার উড়োজাহাজসহ বড় কিছু কেনা নিয়ে ব্যস্ত। বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমেরিকা থেকে আনতে হচ্ছে গম, সয়াবিন তেল, তুলা, ভুট্টা, এলএনজি-এলপিজি গ্যাসসহ আরো কিছু। কিন্তু খেয়াল করছে না যে, দেশে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ নিয়ে সরকারের তেমন কোনো উদ্বেগ ও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। আকবর আলি খান বলেছিলেন, শ্রমজীবী মানুষের আয় শতগুণ বাড়লেও কোনো লাভ নেই- যদি মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে প্রকৃত মজুরি সেভাবে না বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে কাজের খোঁজে থাকা মানুষের সংখ্যা বেশি- এর তুলনায় তাদের কর্মসংস্থান বাড়ে না। কয়েক বছর আগে বলা কথা এখন আরো বেশি প্রযোজ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, দেশের মূল্যস্ফীতি কিছতা কমেছে। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই। অর্থনীতিবিদেরা এটাকে বলছেন ‘মূল্যবৃদ্ধির গতি কমার’ আভাস। এর অর্থ, বাজারদর কমেনি; বরং আগের চড়া দামের ওপর নতুন করে দাম বাড়ার গতি সামান্য ধীর হয়েছে মাত্র।
অসংখ্য পরিবার মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের মতো আমিষ খাওয়া একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে। এই পরিবারগুলো চেষ্টা করত, আর কিছু না হোক, অন্তত সন্তানের মুখে একটা ডিম তুলে দিতে। সেই ডিমের হালি এখন ৫৫-৬০ টাকা। ফলে মানুষের পুষ্টিগ্রহণের হার আশঙ্কাজনক হারে কমছে। তাহলে দোকানে থরে থরে সাজানো এত দেশি-বিদেশি পণ্য, চারপাশের দোকানে সাজানো নানা ধরনের ফল, বাজারের বড় বড় মাছ, মাংস, মুরগি কিনছেন কারা? কিনছেন ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। বাজারে দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া হলেও তাদের জীবনপ্রবাহে কোনো প্রভাব পড়ে না।
স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাজারে বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের ওপর তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। ধনী ক্রেতাদের জন্য তার এই কথাটা ঠিক। কিন্তু সাধারণ ক্রেতাদের জন্য তা বিপরীত।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশে ধনীর সংখ্যা কত যে তারা কিনতে পারলেই বাজার স্থির থাকবে? ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় এবং সম্পদের বণ্টনে অসমতা এক দশক ধরে একই রকম আছে। জাতীয় আয়ের বড় অংশই ধনী শ্রেণির মানুষের পকেটে চলে যাচ্ছে। স্বল্পসংখ্যক ধনীর হাতেই রয়েছে বেশি সম্পদ।
‘প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকস’-এর বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন ২০২৬-এ দেখা গেছে, দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিকানা সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এর মধ্যে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর কাছেই রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আর ৪.৭ শতাংশ সম্পদের মালিকানা ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে। আয়ের ক্ষেত্রেও অসমতা প্রায় একই রকম।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই তীব্র অসংগতিতে। বাজারে পণ্যের দাম দ্বিগুণ-তিন গুণ বাড়লেও সাধারণ চাকরিজীবী, দিনমজুর বা শ্রমজীবী মানুষের বেতন বা দৈনিক আয় বাড়েনি। কাজেই দেশের খুব স্বল্পসংখ্যক ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষ বাজার সচল রাখছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। তাই বাকি মানুষের রুটি-রুজির দিকটা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলার আগেই বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ১৪ থেকে ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। এর মধ্যে অনেকেই অতি দরিদ্রের স্তরে নেমে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিপুলসংখ্যক এসব মানুষকে সুরক্ষা দিতে না পারলে বাংলাদেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দুর্বল অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সেটি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
কোনোমতে এই বেঁচে থাকাকে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ একবার বলেছিলেন, ‘শরীর নিমজ্জিত রেখে নাক ভাসিয়ে বেঁচে থাকা’। দেশের মানুষের বড় একটা অংশ সেইভাবেই নাক ভাসিয়ে বেঁচে আছেন, যেকোনো মুহূর্তে টুপ করে ডুবে যাবেন।
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬
