চাঁদপুরের ইলিশ, নামেই যেমন বাড়তি আকর্ষণ তেমনি চাহিদাও বেশী। আর এই আকর্ষণকেই পুঁজি করে অনলাইনে চলছে, প্রতারণার ফাঁদ। নাহিদস ওয়ার্ল্ড নামে একটি পেজে গেল ২৮ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার টাকার মাছের অর্ডার দেন, মালিবাগের গৃহবধূ সুলতানা। ডেলিভারির চার্জ হিসেবে অগ্রিম হিসেবে দেন, ৫৫০ টাকা। এরপর ডেলিভারির আগে ওটিপির কথা বলে নেয়া হয় মাছ বাবদ পুরো টাকা।
এখানেই শেষ নয়; ওটিপি ফেইলডের বলে ক্রেতাকে ফেরতযোগ্য শর্তে আরেকবার পণ্যমূল্য শোধ করার অনুরোধ করা হয়। দু-দুবার টাকা দিয়েও সেই মাছের দেখা আর পাননি গৃহবধূ সুলতানা। পেজে দেয়া নম্বরে ফোন দিলেও কেউ আর রিসিভ করে না। পরে করা হয়, ব্লক।
সুলতানা জানান, আমি মাছ কেনার জন্য তিন হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এরপর তারা আমাকে বলে, ‘আপনি তো ভুল করেছেন। আপনি খরচের টাকা দেননি, এ কারণে ওটিপি নম্বর যাচ্ছে না। তাই খরচসহ আবার টাকা পাঠান। আপনাকে মাছ দেয়ার সময় আপনার আগের পাঠানো টাকাও ফেরত দেয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, খরচসহ টাকা পাঠানোর পর তারা আবার আমাকে বলে, ‘আপনার ওটিপি নম্বর যাচ্ছে না। আপনি আবার আমাকে ৬ হাজার টাকা দিন। তাহলে আপনাকে আগের টাকাগুলো ফেরত দেয়া হবে।
একই অভিযোগ চাঁদপুরের ইলিশ ঘাট পেইজ নামে আরেকটি প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে। যেখানে যোগাযোগের যে নম্বর দেয়া আছে, সেটি নাহিদস ওয়ার্ল্ড পেইজে থাকা মোবাইল নম্বর। এখানে প্রতারণার শিকার হন, মিরপুরের বাসিন্দা ইফতেখার আহমেদ।
ইফতেখার আহমেদ জানান, মাছ অর্ডার করার পর তারা বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম পেমেন্ট করতে বলে। তাদের কথামতো আমরা অগ্রিম টাকা পাঠাই। এরপর তারা জানায়, তাদের বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে গেছে, তাই আমাদের আবার পেমেন্ট করতে হবে। তাদের কথায় আমরা দ্বিতীয়বারও টাকা পাঠাই। কিন্তু এরপর তারা মাছ সরবরাহের বিষয়ে আর কোনো কথা বলে না। পরে আমরা আবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হিসাব জানতে চাইলে তারা আরও টাকা পাঠাতে বলে এবং জানায়, টাকা পাঠালেই আমাদের মাছ দেওয়া হবে। তখন আমরা বুঝতে পারি, এটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে, নাহিদস ওয়ার্ল্ড ভেরিফাইড পেইজের কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের নাম ও ভিডিও ব্যবহার করে অসংখ্য ভুয়া পেইজ তৈরি করা হয়েছে। যারা গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এরইমধ্যে বেশ কিছু ভুয়া পেইজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী৷
এ বিষয়ে নাহিদস ওয়ার্ল্ডের সেলস অ্যান্ড কাস্টমার এক্সিকিউটিভ মুহাম্মদ রবিউল হোসাইন বলেন, আমরা সাধারণত কোনো অগ্রিম টাকা নিই না। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধের বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেক কাজ করছি। বর্তমানে সিআইডি ও সাইবার ক্রাইম অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছি। আমরা প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি পেজের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। এরই মধ্যে এ ঘটনায় জড়িত প্রায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।
সাইবার বিশেষজ্ঞ বলছেন, পেজের পরিচয়, ব্যবসায়িক তথ্য ও যোগাযোগের ঠিকানা যাচাই না করে পণ্যের অর্ডার দেয়া উচিত নয়। এছাড়া, যেকোনো পণ্য ক্যাশঅন ডেলিভারি করলে, এমন ভোগান্তি থাকবে না।
এদিকে সাইবার বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ক্যাশ অন ডেলিভারি খুব একটা সুবিধাজনক মাধ্যম নয়। কিন্তু মানুষ ই-কমার্স ব্যবসার ওপর যথেষ্ট আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলেই ক্যাশ অন ডেলিভারির দিকে বেশি ঝুঁকছে। এ কারণে এই পদ্ধতিই বেশি জনপ্রিয়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে, যাতে প্রতারক চক্রের কারণে তাদের ব্যবসার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়। অনেকেই সফলতার সঙ্গে ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং ভালো ব্যবসা করছেন। কিন্তু একই খাতের মধ্যে কিছু প্রতারক চক্রও রয়েছে, যারা মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রতারিত করছে।
চাঁদপুরের ইলিশ দেয়ার কথা বলে প্রতারণার অভিযোগে, গেল মাসে নড়াইল থেকে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
