বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়ে দ্রুত গলছে অ্যান্টার্কটিকার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ‘ডুমসডে হিমবাহ’ নামে পরিচিত থোয়াইটস । উষ্ণ সমুদ্রের পানি হিমবাহটির নিচে প্রবেশ করে বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। এতে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগের পূর্বাভাসের দ্বিগুণ বাড়তে পারে। চলতি সপ্তাহে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষকরা যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, থোয়াইটস হিমবাহের বরফ গলার কারণে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০ মিলিমিটার বা প্রায় ১ দশমিক ২ ইঞ্চি বাড়তে পারে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই হিমবাহের বরফ গলার গতি বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও বেশি।
গবেষকরা বলছেন, হিমবাহটির নিচে উষ্ণ সমুদ্রের পানি প্রবেশের প্রক্রিয়া এতদিন পুরোপুরি বোঝা যায়নি। নতুন কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে সেই
প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
থোয়াইটস হিমবাহ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
থোয়াইটসকে ‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ বা ‘বিপর্যয়ের হিমবাহ’ বলা হয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রশস্ত হিমবাহ। এর আয়তন প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এটি আফ্রিকার দেশ সেনেগালের প্রায় সমান। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের চেয়েও বড়। হিমবাহটি অ্যান্টার্কটিকার পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত মেরি বার্ড ল্যান্ডের ওয়ালগ্রিন উপকূলে অবস্থিত। এটি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তরের অংশ।
এই বরফস্তরে আরও অনেক হিমবাহ রয়েছে। পুরো বরফস্তরের আয়তন থোয়াইটসের প্রায় ১৪ গুণ। ১৯৪৭ সালে প্রথম থোয়াইটস হিমবাহের মানচিত্র তৈরি করা হয়। প্রয়াত মার্কিন হিমবাহবিজ্ঞানী ফ্রেডরিক টি থোয়াইটসের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। তবে তিনি নিজে কখনো হিমবাহটি পরিদর্শন করেননি।
১৯৮০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা প্রথম জানতে পারেন, থোয়াইটস দ্রুত গলছে। এর পর থেকেই হিমবাহটির পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশাল আয়তনের কারণে থোয়াইটসের সম্পূর্ণ ধস বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন না, আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই হিমবাহটি পুরোপুরি ধসে পড়বে। এমন ঘটনা ঘটতে আরও কয়েক দশক কিংবা কয়েক শতাব্দীও লেগে যেতে পারে।
থোয়াইটস ও পাইন আইল্যান্ডের মতো হিমবাহগুলো পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তরকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাইন আইল্যান্ড হিমবাহটি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকা থেকে আমুন্ডসেন সাগরের পাইন আইল্যান্ড উপসাগরে প্রবাহিত হয়।
এই হিমবাহগুলো বিশাল বরফস্তরের সামনের দিকে প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে। ফলে ভেতরের বরফ দ্রুত সমুদ্রে নেমে যেতে পারে না। কিন্তু এসব হিমবাহ গলে গেলে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। পুরো বরফস্তর গলে গেলে বিশ্বের বহু উপকূলীয় শহর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রায় ৪ শতাংশের জন্য থোয়াইটস হিমবাহের বরফগলা দায়ী।
বিভিন্ন গবেষণার হিসাবে ২০০০ সাল থেকে হিমবাহটি এক লাখ কোটি টনের বেশি বরফ হারিয়েছে। এখনো প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টন বরফ হারাচ্ছে এটি।
হিমবাহটি কেন গলছে?
বিজ্ঞানীদের মতে, থোয়াইটস হিমবাহ গলার প্রধান কারণ উষ্ণ সমুদ্রের পানি। এই পানি হিমবাহের নিচে প্রবেশ করে বরফ গলিয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে। বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে মেরু অঞ্চলের হিমবাহগুলোতে। ২০১৯ সালে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি থোয়াইটস হিমবাহের নিচে একটি বিশাল ফাঁপা জায়গার সন্ধান পায়। পানির নিচে থাকা ওই গহ্বরের আয়তন নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান। সূত্র: আল-জাজিরা
