শুধু বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করে পাকিস্তান দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তা হুমকি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু অর্জিত সাফল্যকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার দায়িত্ব বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই পালন করতে হবে। সাংবিধানিক শাসন, রাজনৈতিক সংলাপ, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের আস্থার সমন্বয়েই পাকিস্তানের ফেডারেল গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে।...
২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) প্রদেশে গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে ফেডারেল সরকারের সুপারিশ অনুমোদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইসলামাবাদ ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের কৌশল নিয়ে মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুদ্ধ, বহিঃশত্রুর আগ্রাসন কিংবা এমন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কারণে পাকিস্তানের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যেতে পারে, যা মোকাবিলা করার ক্ষমতা কোনো প্রাদেশিক সরকারের নেই। অন্যদিকে, ২৩৪ অনুচ্ছেদ ভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার বিধান দেয়। রাষ্ট্রপতি যদি সন্তুষ্ট হন যে, কোনো প্রদেশের সরকার সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারছে না, তাহলে এই অনুচ্ছেদের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। উভয় অনুচ্ছেদই ফেডারেল সরকারকে বিশেষ পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা দিলেও এগুলোর আইনগত শর্ত ও পরিণতি এক নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধ নিরসনের সহজ উপায় হিসেবে এসব ক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত নয়।
ফেডারেল সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান প্রয়োগের বাস্তব ও আইনসম্মত শর্ত বিদ্যমান। কোনো অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ, প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিরোধ থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না যে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার সাংবিধানিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিরাপত্তাসংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ যেমন জরুরি, তেমনি সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে দাবি করার জন্যও সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকা আবশ্যক।
২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে জারি করা ঘোষণা এবং তা বহাল রাখার ক্ষেত্রে সংসদীয় তদারকি ও সংবিধানে নির্ধারিত সময়সীমা প্রযোজ্য। অন্যদিকে, ২৪৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ফেডারেল সরকারের আহ্বানে সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে এবং বহিঃআগ্রাসন বা যুদ্ধের হুমকি থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংবিধান ও প্রযোজ্য আইন মেনে চলতে হবে। ১১ অক্টোবর সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গৃহীত পদক্ষেপ থেকে পৃথক একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা। এর অর্থ এই নয় যে, বেসামরিক সরকার স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা তৎপরতা, সামরিক পরিকল্পনা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। জঙ্গিগোষ্ঠী যখন সাধারণ নাগরিক, পুলিশ স্টেশন, সরকারি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তখন সেনাবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। তবে শুধু সামরিক অভিযান পরিচালনা করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। পুলিশ, কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট (সিটিডি), বেসামরিক প্রশাসন, সরকারি কৌঁসুলিদের দপ্তর এবং বিচার বিভাগকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
সামরিক সহায়তার লক্ষ্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা, উপযুক্ত বেসামরিক তদারকি নিশ্চিত করা, আইনসম্মতভাবে অভিযান পরিচালনা করা এবং সাফল্য পরিমাপের নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, অনিয়মের জন্য জবাবদিহি এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনকে নিরাপত্তা কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দেওয়া নয়।
দীর্ঘ সময় ধরে গভর্নর শাসন বহাল থাকলে তা গুরুতর রাজনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। যদি জনগণের কাছে এ ব্যবস্থা প্রকৃত সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল বা ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা কমতে পারে, বিক্ষোভ তীব্র হতে পারে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে পারস্পরিক সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, যথাযথ আইনগত ভিত্তিতে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এবং সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যে পরিচালিত হস্তক্ষেপ নিরাপত্তা সমন্বয় ও প্রশাসনিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। ফেডারেল সরকারের উচিত স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট মানদণ্ড প্রকাশ করা, সংসদে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন পেশ করা এবং গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনার বিশ্বাসযোগ্য সময়সূচি নির্ধারণ করা। সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড হবে সাংবিধানিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফেডারেল নিয়ন্ত্রণ কত দিন স্থায়ী হলো তা নয়।
ফেডারেল সরকারের উচিত প্রাদেশিক পুলিশ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান উন্নত করা, গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অস্থিতিশীলতায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, উপজাতীয় প্রবীণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বৈধ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ অপরিহার্য। নিরাপত্তা অভিযানে সশস্ত্র জঙ্গিদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের পার্থক্য করতে হবে। এমন নীতি এড়িয়ে চলতে হবে, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সদস্য সংগ্রহের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়।
কেপি ও বেলুচিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ফেডারেল সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশলের ওপর। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে সাময়িক সাফল্যের পর সেখানে কার্যকর বিদ্যালয়, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, নির্ভরযোগ্য পুলিশি ব্যবস্থা, কার্যকর আদালত, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং জবাবদিহিমূলক স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের উচিত কেপির নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ সংলাপ শুরু করা, সর্বদলীয় নিরাপত্তা সমন্বয়ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি অভিন্ন কর্মপরিকল্পনায় পৌঁছানো। সংসদকে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচার বিভাগকে স্বাধীন থাকতে দিতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৃণমূল পর্যায়ের অভিযোগ ও সমস্যা সমাধানে ক্ষমতায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতিতে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং তরুণদের জন্য সুযোগ সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাষ্ট্রকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ভিন্নমত ও সহিংসতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। আইনসম্মত প্রতিবাদকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে, রাজনৈতিক পরিচয় সহিংসতা কিংবা বৈধ নিরাপত্তা অভিযান বাধাগ্রস্ত করার অজুহাত হতে পারে না। জাতীয় জীবনে মেরুকরণকে স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হওয়া থেকে রোধ করতে আইনের ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ অপরিহার্য।
কেপিতে গভর্নর শাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত, যার বৈধতা ও কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত এর বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতেই বিচার করা হবে। নাগরিকদের সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের সময় অসাধারণ ক্ষমতার ব্যবহারও সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকতে হবে। সংবিধানের ২৩২, ২৩৪ ও ২৪৫ অনুচ্ছেদ পৃথক আইনগত ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে; এগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অবাধ ক্ষমতা দেয় না।
কেপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই হস্তক্ষেপের ফলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য উন্নতি ঘটে কি না, জনগণের আস্থা ফিরে আসে কি না এবং স্বাভাবিক সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হয় কি না, তার ওপর। বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে তার নিজস্ব বাস্তবতা ও চাহিদার আলোকে; কেপিতে গৃহীত মডেল সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়।
শুধু বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করে পাকিস্তান দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তা হুমকি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু অর্জিত সাফল্যকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার দায়িত্ব বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই পালন করতে হবে। সাংবিধানিক শাসন, রাজনৈতিক সংলাপ, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের আস্থার সমন্বয়েই পাকিস্তানের ফেডারেল গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক (ইসলামাবাদ, পাকিস্তান)
amankhannaveed@gmail.com
