যানবাহনের কালো ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ কমাতে ৫০৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পরামর্শক সেবার জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ আসবে বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে। ঋণের টাকার বড় একটি অংশ পরামর্শক খাতে ব্যয় হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট (বিসিএপি) ফেজ-১: ভেহিকল ইমিশন কন্ট্রোল’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রকল্পের পরামর্শক সেবাসহ কয়েকটি খাতের ব্যয় নিয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫০৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ ৪৬৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত।
প্রকল্পে পরামর্শক সেবার জন্য ৬০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ব্যয় হবে ৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রশাসনিক খরচ ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রকল্পের ঋণ থেকে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
যেসব খাতে ব্যয় হবে প্রকল্পের অর্থ
প্রকল্পের ঋণের অর্থ থেকে আসবাবপত্র কেনার জন্য দেড় কোটি টাকা, পাঁচটি মোবাইল ফিটনেস ইউনিটের জন্য ৯ কোটি টাকা এবং ২০টি চলমান নির্গমন পরীক্ষা ইউনিটের জন্য ২৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
এ ছাড়া সাতটি যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্রের (ভিআইসি) সরঞ্জাম কেনার জন্য ৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাতটি অফিস ভবন নির্মাণ ও সাইট প্রস্তুতের জন্য ব্যয় হবে ২৬৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পাঁচটি ভিআইসি গ্যারেজ নির্মাণে প্রকল্পের ঋণ থেকে ব্যয় করা হবে ৩ কোটি টাকা।
এসব ব্যয় নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের আওতা
প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকাগুলো হলো খুলনা, চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নোয়াখালী। এ ছাড়া ঢাকা বিআরটিএর প্রতিটি জেলা সার্কেল অফিসে ভ্রাম্যমাণ যানবাহন নির্গমন পরীক্ষা ইউনিট স্থাপন করা হবে।
ছয়টি মেট্রো সার্কেল আদালতের জন্য আটটি অফিসে ১২টি ইউনিট এবং বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের জন্য আটটি ইউনিট ব্যবহার করা হবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবহন খাত থেকে ধোঁয়া নির্গমন কমানো, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় যানবাহন পরিদর্শন কর্মসূচির উন্নয়ন এবং যানবাহন পরিদর্শনের নিয়মকানুন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি সড়ক থেকে পুরোনো, অনিরাপদ ও অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহন অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিআরটিএর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের মোটরযান নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে পরিদর্শন করে অতিরিক্ত দূষণকারী যানবাহন শনাক্ত করা জরুরি। এসব যানবাহন মেরামত করা অথবা সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও পার্টিকুলেট ম্যাটারের মতো ক্ষতিকর দূষকের নির্গমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো সম্ভব হবে, যা জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে পরিবেশগত বিধিবিধান ও সরকার নির্ধারিত মান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। পরিবহন খাত থেকে বায়ুদূষণ কমানো গেলে দূষণজনিত রোগের প্রকোপ এবং এ-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও কমতে পারে।
‘অতীতের প্রকল্প কাজ করেনি’
প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্প অতীতেও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন রোধে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘গাড়ি না নিয়েও অনেকে ফিটনেস সনদ পেয়ে যাচ্ছেন। এটা বন্ধ করতে হবে। সত্যিই বিশ্বব্যাংক যদি এ কাজ করতে চায়, তাহলে ভালো হবে। বিশ্বব্যাংক যেন বিজ্ঞানভিত্তিক সেবা দেয়। তবে অতীতের প্রকল্পগুলো কাজ করেনি। পুলিশকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না।’
সড়কে যানবাহনের কালো ধোঁয়া প্রসঙ্গে ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘গাড়ি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অনেকে ঘুষের বিনিময়ে অনেক কিছু করছেন। তবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ হলে মন্দ হবে না, যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে।’
পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রথমে ৪৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব পাঠায়। এ প্রকল্পের ওপর ১৩ মে ২০২৫ তারিখে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পিইসি সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ মোট ৪৭৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করে কমিশনে পাঠায়। তবে পরিপত্রের নির্দেশনা লঙ্ঘন এবং পিইসি সভার সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সরকারি অর্থায়নের (জিওবি) ব্যয় বৃদ্ধি, পরামর্শক খাতে পরিবর্তন এবং নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে যৌক্তিকতা জানতে চেয়ে ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে চিঠি দেয় পরিকল্পনা কমিশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগটি ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে ব্যয় বৃদ্ধি, পরামর্শক খাতে পরিবর্তন ও নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা উল্লেখ করে কমিশনে চিঠি পাঠায়।
পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) বাইরে থাকায় অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সম্মতি কার্যক্রম বিভাগে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের ডিপিপি পুনরায় পরীক্ষা করে বাস্তবায়নকাল হালনাগাদ করার কথা বলা হয়।
ডিপিপি পুনর্গঠন করে আবার পাঠানোর জন্য ২৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগটি প্রকল্প ব্যয় ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ৫০৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত।
রাজধানীর নিশ্বাসে বিষ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বায়ুদূষণের কারণে রাজধানীতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে। বাতাসে ছড়িয়ে থাকা দূষিত কণার কারণে রাজধানীবাসীকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে হচ্ছে। বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের যানবাহন। পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের কালো ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে নগরজীবন। অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না।
ঢাকায় ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে মাত্র ৯৮টি সচল। এসব রুটে চলাচল করছে বিপুলসংখ্যক ফিটনেসবিহীন যানবাহন। বায়ুদূষণ পরিস্থিতির উন্নয়নে এক হাজারের বেশি বাস অপসারণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তবে বায়ুদূষণের জন্য শুধু ফিটনেসবিহীন যানবাহনই দায়ী নয়; এর সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটও জড়িত।
ফিটনেসবিহীন, ঝুঁকিপূর্ণ, ক্ষতিগ্রস্ত ও পরিবেশদূষণকারী মোটরযান সড়কে চলতে পারবে না বলে গত জুনে জানিয়েছিল বিআরটিএ। কিন্তু এরপরও রাজধানীর সড়কে কালো ধোঁয়া ছড়ানো বাসের উপস্থিতি কমেনি। ফলে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের যানবাহন রাজধানীর বায়ুদূষণের অন্যতম বড় উৎস।
বিআরটিএর তথ্যমতে, সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ৬৪ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে নিবন্ধিত প্রায় ২৪ লাখ। ঢাকার বাইরে রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মোটরযান। নিবন্ধিত মোটরযানের মধ্যে সংখ্যায় বেশি মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি। দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে প্রায় ৫১ লাখ। এ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে প্রায় ৬ লাখ।
এসব মোটরযানের প্রায় সাড়ে ৬ লাখের ফিটনেসের অর্থনৈতিক মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আর প্রায় ৩০ হাজার বাস-মিনিবাস মেয়াদোত্তীর্ণ। এ ছাড়া প্রায় ৪৭ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাংকলরির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
‘আমরা পরিবহন খাতের উন্নতি করতে পারিনি’
বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘বায়ুদূষণ কমাতে হবে। আমাদের বাসগুলোর দিকে তাকান। গত ৩৫ বছর ধরে একই অবস্থা। গাড়ির কালো ধোঁয়ায় আমরা অতিষ্ঠ। এটা বন্ধ করতে হবে। আমাদের আশপাশের দেশগুলো পারলেও আমরা পরিবহন খাতের উন্নতি করতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা পুরোনো গাড়ি চালাই, খারাপ তেল ব্যবহার করছি। বারবার বৈদ্যুতিক যানবাহনের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা দেখতে পাচ্ছি না। তবে এটি করতে পারলে ঢাকার বায়ুর মান অনেকাংশে ভালো হবে।’
নগরীতে সূক্ষ্ম বস্তুকণা মিলে কালো কার্বন তৈরি হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘এই কালো কার্বন বছরের অর্ধেকের বেশি সময়জুড়ে রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। যানবাহনের ফিটনেস ঠিক করতে পারলে এ সমস্যা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।’
সড়ক থেকে পুরোনো যানবাহন ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়া, কঠোরভাবে কালো ধোঁয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া বায়ুদূষণ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন এই পরিবেশবিদ।
