আজকাল ওয়েবডেস্ক: উৎসবের মরশুমে এবার 'বৈধ' আলোয় ঝলমল করে উঠবে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা ব্লকের অন্তর্গত আঁধুয়া গ্রাম। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশের বেশিরভাগ গ্রামে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ চলে এলেও এক অদ্ভুত কারণে এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ এতদিন টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ নিতে রাজি ছিলেন না। অভিযোগ, গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ 'চুরি' করে বিদ্যুৎ নিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
তবে রাজ্য সরকার পরিবর্তনের পর কেন্দ্র এবং রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে, ফরাক্কার আঁধুয়া গ্রামে এনটিপিসি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ও রাজ্য বিদ্যুৎ দপ্তরের উদ্যোগে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিদ্যুতের খুঁটি এবং বিদ্যুৎবাহী তার। এর ফলে উৎসবের মরশুমে গোটা গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ 'চোরের' অপবাদ ঘুচিয়ে এবার টাকা দিয়েই বিদ্যুৎ নেবেন। আলোয় ঝলমল করে উঠবে গোটা গ্রাম।
২১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ফরাক্কা এনটিপিসি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১৯৮৬ সালে জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল। এখানে বর্তমানে ছ'টি ইউনিট চালু রয়েছে।
আঁধুয়া গ্রামের বেশ কিছু বাসিন্দা দাবি করেন, প্রায় ৪০ বছর আগে যখন এনটিপিসি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয় সেই সময়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জমি দান করেছিলেন। এই প্রকল্পে জমি দান করার জন্য সেই সময় বেশ কিছু পরিবারের সদস্যকে চাকরি ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল।
এনটিপিসি প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু গেলে আশেপাশের এলাকা সহ সংলগ্ন আঁধুয়া গ্রাম আলোকিত করার জন্য এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ রাস্তার ধারে পথবাতি বসিয়ে দিয়েছিলেন। এই পথবাতি বসানোর জন্য যে বিদ্যুতের তার এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ লাগিয়েছিলেন পরবর্তীকালে আঁধুয়া গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দা সেখান থেকে 'হুকিং' করে নিজেদের বাড়িতে বিদ্যুৎ নিতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীরা দাবি করতে শুরু করেন এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ আঁধুয়া গ্রামে বিনামূল্যে সমস্ত পরিবারকে বিদ্যুৎ দিতে বাধ্য।
যদিও প্রথম থেকেই এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ বলে আসছিলেন তাঁরা সরাসরি কোনও পরিবারকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারেন না। সেই কারণে আঁধুয়া গ্রামের কোনও বাড়িতে বিদ্যুতের মিটার সংযোগও তাদের তরফ থেকে দেওয়া হয়নি। এতদিন বেআইনিভাবে 'হুকিং' করে বেশিরভাগ গ্রামবাসী নিজেদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এসি, ফ্রিজ সহ দৈনন্দিন সমস্ত কাজ চালিয়ে এসেছিলেন। এর ফলে প্রত্যেক মাসে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে এনটিপিসি কর্তৃপক্ষকে। যদিও রাজ্য বিদ্যুৎ দপ্তরের খাতায় 'বিদ্যুৎবিহীন' গ্রাম হিসেবে থেকে গিয়েছে আঁধুয়া।
অভিযোগ উঠেছে গ্রামবাসীরা এইভাবে বেআইনি বিদ্যুৎ নেওয়ার কারণে দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দারা প্রায় সারা বছরই 'লো ভোল্টেজের' সমস্যায় ভুগতেন। এই কারণে বছরখানেক আগেই আঁধুয়া দক্ষিণপাড়ার কয়েক'শ পরিবার বিদ্যুৎ দপ্তরে আবেদন করে বৈধভাবে বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে নিয়েছেন। এর ফলে দক্ষিণপাড়া লোকেদেরকে আর 'লো ভোল্টেজের' সমস্যায় ভুগতে হয় না। যদিও উত্তর এবং মধ্যপাড়ার সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরেই এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্য বিদ্যুৎ দপ্তর আঁধুয়া গ্রামের সমস্ত পরিবার যাতে বৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে পারেন সেই বিষয়ে উদ্যোগে হন। সূত্রের খবর, এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই ওই গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি এবং তার বসাতে ১ কোটি ৯১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে এবং রাজ্য বিদ্যুৎ দপ্তর বাকি পরিকাঠামোগত কাজ দ্রুত গতিতে করছে। ইতিমধ্যেই আঁধুয়া গ্রামের বেশিরভাগ অংশই বিদ্যুতের খুঁটি লাগানোর কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। সকলের আশা উৎসবের মরশুমে 'বৈধ' আলোয় ঝলমল করে উঠবে আঁধুয়া গ্রামের প্রতিটি বাড়ি।
বেনিয়াগ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান তথা আঁধুয়া গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, "এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ গ্রামের মধ্য দিয়ে বিদ্যুতের তার নিয়ে গেলেও কোনও ট্রান্সফরমার বসায়নি, 'থ্রি ফেজ' লাইন দিয়ে রেখে দিয়েছিল। কিছু লোক মনে করেন তাঁরা এনটিপিসি থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার যোগ্য, তাঁরাই এনটিপিসির লাইন থেকে নিজেদের বাড়িতে বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েছিলেন। তবে এখন বেশিরভাগ মানুষই বৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য আবেদন করে ফেলেছেন। আমরা আশাবাদী খুব শীঘ্রই আমাদের বাড়িতে মিটার সংযোগ থেকে বিদ্যুতের বিদ্যুৎ পেয়ে যাব।"
ফরাক্কার বাসিন্দা তথা বিজেপির মালদহ (দক্ষিণ) সাংগঠনিক জেলা সম্পাদক অয়ন ঘোষ বলেন, "ওই গ্রামে বিদ্যুৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা ছিল। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার গ্রামে বিদ্যুতের পোল ও তার লাগানো শুরু করেছে। এনটিপিসি কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছেন ওই গ্রামে পানীয় জলের ব্যবস্থা করে দেবেন এবং নিয়মিত সেখানকার মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য শিবির করা হবে।"
রাজ্যের বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী গার্গী দাস ঘোষ বলেন, "আগের সরকারের আমলে কী হয়েছে আমরা জানি না। আমাদের সরকার কোনও অবৈধ কাজে মদত দেবে না, 'হুকিং' করে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া বরদাস্ত করা হবে না।"
তিনি বলেন, "আমার মনে হয় ওই গ্রামের বাসিন্দারা এতদিন কোনও ভুল ধারণা থেকে মনে করতেন তাঁরা আজীবন বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার যোগ্য। নিশ্চয়ই তাঁরা জমি দেওয়ার জন্য এনটিপিসি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। বৈধভাবে বিদ্যুৎ নিলে সরকারের ঘরে যেমন রাজস্ব ঢুকবে তেমনই গ্রামবাসীরা লো ভোল্টেজের সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন এবং বিদ্যুৎ দপ্তররে অন্যান্য সুবিধা পাবেন। বিদ্যুৎ দপ্তর ওই গ্রামে প্রত্যেক বাড়িতে বৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কাজ করছে। আমরা আশাবাদী উৎসবের মরশুমে সকলের বাড়ি বৈধ-বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে উঠবে।"
