কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং অসংখ্য মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি পর্যটন আবাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। পর্যটন মানুষের আনন্দ, অবকাশ ও নতুন অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র। সেখানে জীবনের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়লে পর্যটকের আস্থা ও শিল্পের সুনাম দুটিই বিপন্ন হয়।
বিভিন্ন সূত্রে অগ্নিনিরাপত্তা–সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সতর্কতার বিষয়টি সামনে এসেছে। যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সেই সতর্কতার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? নিরাপত্তাঝুঁকি দূর হয়েছিল কি? প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি? এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি। তদন্তের আগে কাউকে দায়ী করা নয়, বরং তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত দায় নির্ধারণই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
নামের আড়ালে পরিচয়ের বিভ্রান্তি: দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউস, হোমস্টে ও লজ বিভিন্ন ধরনের আবাসন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। কিন্তু আবাসনের প্রকৃত ধরন ও সুযোগ–সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই নামের সঙ্গে ‘রিসোর্ট’ কিংবা ‘ইকো রিসোর্ট’ যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত হলেই কোনো স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। একইভাবে, নামের সঙ্গে ‘রিসোর্ট’ যুক্ত করলেই তা মানসম্মত রিসোর্টের মর্যাদা পেতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত অবকাঠামো, সেবার মান, সুযোগ–সুবিধা, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। পরিচয়ের এই অস্পষ্টতা পর্যটকের প্রত্যাশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তায় অবহেলা, পরিণতি অপূরণীয়: অগ্নিনিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত। কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, অ্যালার্মব্যবস্থা, নিরাপদ জরুরি নির্গমনপথ, ঝুঁকিমুক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী একটি পর্যটন আবাসনের জন্য এসব অপরিহার্য।
বিশেষত রাতে আগুন লাগলে ঘুমন্ত পর্যটকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। ধোঁয়া ও আগুনে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক মিনিটের বিলম্বও প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই শুধু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা কিংবা কাগজে–কলমে অনুমোদন থাকাই যথেষ্ট নয়; বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর কি না, সেটিই আসল বিবেচ্য।
ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন উদ্যোক্তার অধিকার। কিন্তু নিরাপত্তায় অবহেলা করে সেই মুনাফা অর্জনের সুযোগ নেই। পর্যটকের জীবন রক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসায়িক সাফল্যকে যুক্তিসংগত বলে দাবি করতে পারে না।
সতর্কতার পরও দুর্ঘটনা কেন?: টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনায় পূর্ববর্তী সতর্কতার বিষয়টি সত্য হলে প্রশাসনিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত হওয়ার পর তা নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল এবং নিরাপত্তার ঘাটতি থেকে থাকলে তা কেন দূর হয়নি এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সতর্কতা যদি কার্যকর পদক্ষেপে পরিণত না হয়, তবে তা মানুষের জীবন রক্ষায় কতটা কার্যকর সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় পুরো পর্যটনশিল্পের ওপর চাপানোও যুক্তিসংগত নয়। দায়িত্বশীল উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, সুনাম ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অবদান রয়েছে। প্রকৃত দায় নির্ধারণে আবেগ নয়, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
পর্যটনের বিকাশ হোক নিরাপদ ও দায়িত্বশীল: পর্যটনশিল্পের সমপ্রসারণের সঙ্গে আবাসন, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। এ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার ঘাটতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে পর্যটকের প্রাণহানি ঘটলে তার ক্ষতি একটি পরিবারের শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সামগ্রিক পর্যটনশিল্পের প্রতি আস্থাকেও আঘাত করে।
‘ইকো রিসোর্ট’ পরিচয়ের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযোজ্য পরিবেশগত অনুমোদনের পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। পরিবেশগত ছাড়পত্র আর অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন এক বিষয় নয়; একটির উপস্থিতি অন্যটির নিশ্চয়তা দেয় না।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা গভীর শোকের। কিন্তু শোক প্রকাশের পর যদি প্রকৃত কারণ, দায়িত্ব ও নিরাপত্তার ঘাটতি অজানাই থেকে যায়, তবে এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত, দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাক, বিনিয়োগ বাড়ুক, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক কিন্তু কোনো পর্যটকের জীবন যেন সেই অগ্রযাত্রার মূল্য না হয়। এখন সময় শোককে দায়বদ্ধতায়, সতর্কতাকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নিরাপত্তায় রূপ দেওয়ার। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটন আবাসনে নিরাপত্তার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা হোক এই মর্মান্তিক ঘটনার বাস্তব শিক্ষা। মনে রাখতে হবে, পর্যটকের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই, নিরাপত্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সাফল্য নেই। আর কোনো পরিবার যেন প্রিয়জন হারিয়ে এমন অসহনীয় শোকের মুখোমুখি না হয় এটাই হোক পর্যটনশিল্পের প্রতিটি উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট সবার অঙ্গীকার।
লেখক: প্রাবন্ধিক; ডিরেক্টর, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)
