মুক্তধারা
উৎসব ১৪৩৩
অন্যকথা
উৎসবেও — ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না
সৌরভ দত্ত
২০ অক্টোবর ২০২৬
অষ্টমীর রাত্রিটা কিভাবে যেন হুশ করে কেটে গেল।ধুনুচি নাচের তালে তালে। চকচক করছিল মায়ের মুখ।বৈঠকী আড্ডায় রবীন্দ্রনাথের গান--"আমি চিনি গো চিনি তোমারে..."।সাথে কবিতার ভাষ্যপাঠ। কচিকাঁচাদের নাচ বাড়ির ঠাকুর দালানে। কয়েকবছর আগের স্মৃতি ফিরে এসেছিল।
চিকু ভাবছিল বাবার কথা । এরকমই বৈঠকী আড্ডায় সে বাবাকে অনেকবার সুকান্তের বোধন কবিতা আবৃত্তি করতে শুনেছে। সকাল সকাল পাজামা পাঞ্জাবী পরে ধোপদুরস্ত হওয়ার পর।অষ্টমী সন্ধ্যায় সে বাবার সেই প্রিয় কবিতাটা আবৃত্তি করছিল যখন চোখটা জলে ভরে উঠেছিল।
মায়ের পায়ের নিচে সাজানো একশ আট পদ্ম।বাড়িটা বেশ কিছুটা অংশ যেন বনজঙ্গলে খণ্ডহর হয়ে উঠেছে।অষ্টমী সন্ধ্যায় আগে যারা ধুনুচি নাচত এখন তারা নেই। নতুন প্রজন্ম এসেছে।নবমী মায়ের ভোগ নিবেদন এর পর সেই ভোগ খাবে সারা পাড়ার লোক।নবমী থেকে ছাপা সন্দেশ ,চন্দ্রপুলি তৈরি হবে।নকশা আঁকা নারকেল সন্দেশ কটাই কাকার খুব প্রিয় ছিল। গুড়ের,চিনির নাড়ু তৈরির চল ছিল।সেই নাড়ু দেওয়া হত প্রণাম করতে আসা মানুষজনকে।নবমী বিকেল মানেই বিষাদের সুর। চিলেকোঠায় দুধসাদা লক্ষ্মীপেঁচার আনাগোনা।অষ্টমী,নবমীতে এখনও শহরের আত্মীয় স্বজন দেশে আসে। গণশক্তি,নন্দন, যুবশক্তি, দেশ হিতৈষী শারদ এরকম প্রগতিশীল সম্ভার আসে বাড়িতে।আগে তার বাবা পড়ত।এখন সে পড়ে।মা কিনত শুকতারা, নবকল্লোল । বাচ্চাদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল কমিক্স আর খেলাধুলার পাতা।
নবমীর দিন পাশের গ্রামের ব্যানার্জি বাড়িতে নাটমন্দিরে রাগ সঙ্গীতের রেওয়াজ আছে। নবমীতে পান খিলি করে রাখা থাকত স্বজনদের জন্য।চিকুর যত্ন করে পান সাজত।মাসি তৈরি করত ছাপা।তবক দেওয়া সন্দেশ আনত দমদমের বাবুমামারা। কয়েকবছরে অনেকেই মারা গেছেন।
ঘাটের বসে বন্ধু শুভেন্দুর সঙ্গে ছিপ ফেলতে ফেলতে চিকু ভাবছে।কাল মায়ের ভাসান। আবার একটা বছরের অপেক্ষা। শিউলির গন্ধ,কাশের দোলা।শহরে দুর্গা ঠাকুর দেখতে যাওয়ার হিড়িক। গ্রাম থেকে সবাই চলে যাচ্ছে শহরে। গ্রামের পুজোর জৌলুস কমছে।শহরে থইথই ভিড়। প্রশাসন , ম্যানেজমেন্ট নড়বড়ে।তবুও শিকড় ছেড়ে মেট্রোপলিটন সংস্কৃতির টানে ছুটছে মানুষ....মেট্রোয় সাংঘাতিক ভিড় দরজা দেওয়া যাচ্ছে না...মানুষ ছিটকে যাচ্ছে প্ল্যাটফর্মে...চারপাঁচজন ছেলের দলের মাঝখানে চিঁড়ে চ্যাপ্টা মেয়েদের সম্ভ্রম-- তবুও ওরা ছুটছে...
চোরবাগানের লাশগুলোর আর্তনাদ নবমীর বিষাদের সুরকে আরো করুণ করে তুলছে...
শরৎচন্দ্র, বিদ্যাসাগর,ভগৎ সিং-রা গড়াগড়ি খাচ্ছে বিসলারি বোতলের মাঝে হাইড্রেনে...যারা এরকম করছে ওর বাবা,কাকারাও শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ পড়ে।এটাও যেনেও ফ্যাসিবাদী কায়দায় ওরা পাতা ছিঁড়ছে , পোড়াচ্ছে বইয়ের দেশ...চিরায়ত সাহিত্য বলায় ঠেলে দিচ্ছে বৃদ্ধকে... মানুষ সব দেখছে...ঢেউ উঠছে... কবিতায়,ছবিতে প্রতিবাদ...
রাস্তায় পড়ে থাকা বই বুকে তুলে উঠে দাঁড়াচ্ছে ঝুপড়ির ছোট্ট সলমন।
