পাকিজার নির্মাণ শুরু হয়েছিল সাদাকালোয়। নানা কারণে পেছাতে পেছাতে মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। তার ফলেই রঙিন করে নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। সাদাকালোয় নির্মিত হলে অবশ্য পাকিজার সৌন্দর্য পূর্ণতা পেত না। কেননা সিনেমাটি অনন্য হয়ে উঠেছে নানা রঙের ব্যবহারে।
প্রিন্ট সংস্কারের পর নতুন করে এসেছে কামাল আমরোহির পাকিজা। অশোক কুমার, রাজ কুমার ও মীনা কুমারী অভিনীত সিনেমাটি ১৯৭২ সালে মুক্তি পেয়েছিল। সে সময় যেন বড় পর্দায় কবিতা লিখেছিলেন কামাল আমরোহি। সে কবিতা ছিলেন স্বয়ং মীনা কুমারী। গল্প খুব আহামরি কিছু না। কিন্তু তার উপস্থাপন ছিল রঙ, পোশাক, প্রপস আর আবহে আড়ম্বরপূর্ণ। এ সিনেমায় রঙ কেবল দৃশ্যের সৌন্দর্য বাড়ায়নি, চরিত্রের মনোজগৎ, প্রেম, বিরহ ও আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে উঠেছিল।
সিনেমায় নার্গিস ও সায়েবজান দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মীনা। একটি দৃশ্যে সে তার প্রেমিক শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কল্পনায় তাদের ভবিষ্যৎ সংসার সাজায়। নার্গিসের পরিকল্পনায়, বাড়িটি হবে সাদা—তাদের পবিত্র ভালোবাসার মতোই শুভ্র। সে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে তিনি প্রবেশ করবেন নববধূর লাল পোশাকে। কিন্তু নার্গিসের পেশা তাদের বিয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত অকালে মৃত্যুবরণ করেন নার্গিস। শাহাবুদ্দিন তখন নার্গিস ও তার কন্যা সায়েবজানের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। সে সিকোয়েন্সে শাহাবুদ্দিনের পোশাকেও নেমে আসে শোকের ছায়া। তিনি পরতে শুরু করেন কালো শেরওয়ানি।
দিল্লির আনন্দ-উল্লাসের জগতে সায়েবজান এক উজ্জ্বল নাম। আগুনরঙা কমলা, প্রবাল-গোলাপি কিংবা পান্নার মতো সবুজ-বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত হয়ে তিনি আকৃষ্ট করেন তার ভক্তদের। অথচ এ চাকচিক্যের আড়ালেই তার একান্ত আকাঙ্ক্ষা, সমাজের চোখে ‘পাকিজা’ বা পবিত্র ও সম্মানিত নারী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। নাচের আসরের বাইরে তাকে বেশির ভাগ সময় দেখা যায় সাদা পোশাকে। তার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষার রঙ যেন সে শুভ্রতাই।
পাকিজার নির্মাণ শুরু হয়েছিল সাদাকালোয়। নানা কারণে পেছাতে পেছাতে মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। তার ফলেই রঙিন করে নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। সাদাকালোয় নির্মিত হলে অবশ্য পাকিজার সৌন্দর্য পূর্ণতা পেত না। কেননা সিনেমাটি অনন্য হয়ে উঠেছে নানা রঙের ব্যবহারে।
ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পুনরুদ্ধার করা পাকিজার একটি প্রিন্ট গত বুধবার ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরে অনুষ্ঠিত লুমিয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। রোববার ছবিটি প্রদর্শিত হওয়ার কথা লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবেও। ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর স্ক্রলকে জানিয়েছেন, কামাল আমরোহির জীবিত সন্তান তাজদার ও রুখসার আমরোহি এবং রুখসারের ছেলে বিলাল আমরোহির সহযোগিতায় ছবিটির পুনরুদ্ধারের কাজ সম্ভব হয়েছে।
সিনেমার দৃশ্যে মীনা কুমারী ছবি: ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন
পুনরুদ্ধার করা ছবিটির একটি ছোট ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছে ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। তাতেই স্পষ্ট হয়েছে এ কাজের তাৎপর্য। যেন ধুলোমাখা পর্দা মুছে দেয়ার পর নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে মীনা কুমারীর পোশাকের উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটা, চিত্রগ্রাহক জোসেফ ভির্শিংয়ের আলোকসজ্জার নান্দনিকতা এবং জটিল অথচ সুনিপুণ সেট নির্মাণের সৌন্দর্য।
‘ইনহি লোগোঁ নে’ গানে সায়েবজানের গোলাপি ওড়নার কথা, মেহেদি রাঙা পায়ের মোহনীয় উপস্থিতি কিংবা প্যাস্টেল গোলাপি রঙে সাজানো গুলাবি মহলের অলিগলিতে তার উদাস ঘুরে বেড়ানো—সবকিছুতেই যেন ধরা পড়ে কমল আমরোহির রঙিন সংস্করণ নির্মাণের সিদ্ধান্তের যথার্থতা।
চিত্রগ্রাহক সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, গণিকা বা তবায়েফদের জীবনকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পাকিজা একটি আদর্শ মানদণ্ড। ক্যামেরার সম্মুখমুখী বিন্যাস, গানের কোরিওগ্রাফি এবং মীনা কুমারীকে কেন্দ্র করে পটভূমির শিল্পী ও সেটের উপাদানগুলোর অবস্থান—সব মিলিয়ে ছবিটির নিজস্ব দৃশ্যভাষা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, তার কাজেও পাকিজার প্রভাব রয়েছে। বিশেষত সঞ্জয় লীলা বানসালির ছবিগুলোয় তার চিত্রগ্রহণের অভিজ্ঞতায় তিনি তা দেখেছেন। বানসালির সিরিজ ‘হীরামান্ডি’র তৃতীয় পর্বে একটি ফোয়ারাকে কেন্দ্র করে ক্যামেরার যে গতিবিধি দেখা যায়, সেটি পাকিজার ‘চলতে চলতে’ গানের অনুরূপ দৃশ্যের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য বলে মনে করেন তিনি।
মুক্তির পর সিনেমাটি খুব একটা সাড়া পায়নি। কিন্তু দিনে দিনে এটি ক্ল্যাসিকে পরিণত হয়। কমল আমরোহির পুত্র তাজদার আমরোহি মনে করেন শাহজাহান যেমন মমতাজ মহলের জন্য তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন, তেমনি কমল আমরোহি মীনা কুমারীর জন্য নির্মাণ করেছিলেন পাকিজা।
স্ক্রল ডটইন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান
