রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় রোববার (১১ অক্টােবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, অবিলম্বে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, চুক্তির বিস্তারিত জানতে তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। মস্কোর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খবর রয়টার্সের।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে কয়েক দিন ধরেই কিয়েভের ওপর চাপ দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য ইউক্রেনের এসব হামলাকে দায়ী করেছেন তিনি। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) জেলেনস্কিকে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইউক্রেনে নতুন নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর বেশ কয়েকটি সুযোগ হারিয়েছেন জেলেনস্কি।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, অবিলম্বে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে। উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। এটি ভঙ্গ করবেন না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। জেলেনস্কি জানান, তিনি ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘোষণাটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করে। রাশিয়ারও এটি সমর্থন করা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় আছি।
তবে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পরও রুশ বাহিনী ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভের একটি যৌথ তাপ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণার পর এ হামলার ঘটনা ঘটে।
এর আগে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা একতরফাভাবে বন্ধ করার বিষয়ে মার্কিন চাপের বিরোধিতা করেন জেলেনস্কি। তিনি দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করলেই কেবল কিয়েভ রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে রাজি হবে।
এদিকে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। জবাবে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে তিনি নির্বাচন আয়োজন করবেন।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের নেতা কে হবেন, তা নির্ধারণের অধিকার দেশটির জনগণের। তবে নির্বাচনের আগে যুদ্ধ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সামরিক আইন কার্যকর থাকায় ইউক্রেনের আইনে নিরাপত্তার কারণে নির্বাচন আয়োজন নিষিদ্ধ।
জেলেনস্কি বলেন, পুতিনকে বলুন, আমাদের দুই মাস—৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি দিন। আমরা নির্বাচন আয়োজন করব।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করারও বিরোধিতা করেছেন জেলেনস্কি। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধই জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বড় কারণ।
ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান দল রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।
এর আগে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। জেলেনস্কি এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এতে রাশিয়া ইউক্রেনে আরও হামলা চালাতে উৎসাহিত হতে পারে এবং প্রাণহানি বাড়তে পারে।
ট্রাম্পের শুক্রবারের ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে, যা প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল জ্বালানির সমান। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও এ চুক্তির সমালোচনা করেছেন। উত্তর ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তি বেআইনি হতে পারে এবং এটি মার্কিন নাগরিকদের ঝুঁকিতে ফেলবে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কয়েকজন বাসিন্দাও ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। ৪০ বছর বয়সী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবিনা বলেন, কেউ আমাদের কী করতে হবে, তা বলে দেওয়ার অধিকার রাখে না। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় যখন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়।’ ট্রাম্পের মন্তব্যকে তিনি মিত্রদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
এদিকে রোববার ইউক্রেনের কর্মকর্তারা রাশিয়ার নতুন হামলার খবর জানিয়েছেন। খারকিভে একটি মুদি দোকানের বাইরে হামলায় তিনজন এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্কে আরও তিনজন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তবর্তী মলদোভাও রুশ ড্রোনের নতুন অনুপ্রবেশের খবর দিয়েছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, ড্রোনগুলো রাজধানী কিশিনাউ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে এসে পড়েছে।
