কুমিল্লায় চাঞ্চল্যকর জান্নাতুন তাজমীন (১৫) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সুমন মিয়া নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার আসামি সুমন মিয়া ওই কিশোরীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর কথা স্বীকার করেছেন।
তবে চালক গ্রেফতার ও মোবাইল উদ্ধারের পরও এ হত্যাকাণ্ডে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা রয়ে গেছে। পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা যায়, মেয়েটির মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে যাওয়ার কথা থাকলেও চালক তাকে ৩০ কিলোমিটার ঘুরিয়ে এক নির্জন ফসলের মাঠে নিয়ে যায়। এই দীর্ঘ পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় অন্য কেউ এতে জড়িত ছিল কিনা- তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া, মেয়েটির পরিবার বেশ কয়েক বছর ধরে কুমিল্লায় বসবাস করার কারণে এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে তার ধারণা থাকার কথা। শহরের দিকে না গিয়ে অটোরিকশাটি সম্পূর্ণ উল্টো পথে চলার পরও মেয়েটি কেন আগে থেকে বিষয়টি টের পেল না বা প্রতিরোধ করল না—সে প্রশ্নও উঠছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল রহস্য ও অন্য কারো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা- তা জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। তিনি বলেন, গ্রেফতার সুমনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তদন্ত চলছে; অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কিনা- তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানখেত থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশের গলায় গামছা ছিল। কাছাকাছি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়িতে কাপড়চোপড় ও পাশে একটি হাতব্যাগ পাওয়া যায়।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলসংলগ্ন তিশা বাস কাউন্টারের কাছে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল কিশোরী। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুমনের অটোরিকশায় ওঠে সে। দর-কষাকষির পর ৩০০ টাকায় বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি হন সুমন; কিন্তু বাড়ির পথে না গিয়ে তিনি উল্টো সড়ক ধরে নির্জন এলাকার দিকে যান।
পদুয়ার বাজার থেকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। পুলিশের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, সুমন প্রথমে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিজরা বাজারের দিকে যান। পরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে লালমাইয়ের ভোরাজগৎপুরের ফসলের মাঠের কাছে পৌঁছান। এ পথে দূরত্ব অন্তত ৩০ কিলোমিটার।
এতটা পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। দুটি আঞ্চলিক মহাসড়কেই রাতে যানবাহন চলাচল করে। কিছু স্থানে লোকজনও কমবেশি থাকে। এ পথে কিশোরীটি কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, কোনো পর্যায়ে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল কিনা- তা স্পষ্ট নয়।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন দাবি করেছেন, অটোরিকশা চলার সময় কিশোরী কোনো ‘প্রতিক্রিয়া’ দেখায়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, পদুয়ার বাজার থেকে কিশোরীর বাসায় যেতে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা লাগার কথা। অথচ তাকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, মেয়েটি যদি ঘটনাস্থলে বা এর আগে অন্তত ৯৯৯-এ কল দিত, তাহলে হয়তো আমাদের এমন একটি মৃত্যু দেখতে হতো না।
পুলিশের দাবি, নির্জন জায়গায় পৌঁছানোর পর কিশোরী পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকাতে ধস্তাধস্তি করেন। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। এরপর ধানখেতে নিয়ে মুখ মাটির দিকে রেখে পা দিয়ে মাথা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে কিশোরী তার বাবাকে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল। ঘুমে থাকা বাবা তখন সেটি দেখেননি। ভোরের দিকে দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন। এর মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করছিল। পরে সেখানে গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন বাবা।
কিশোরী কী পরিস্থিতিতে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল, সে সময় বিপদের আশঙ্কা করছিল কি না এবং লোকেশন পাঠানোর পর কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে ওই সময় পর্যন্ত ফোনটি তার কাছে ছিল, তা বোঝা যায়।
ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সুমন জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ধর্ষণ হত্যার আগে, নাকি পরে ঘটেছে, সে বিষয়েও পুলিশ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে কিশোরীকে অটোরিকশায় বসে থাকতে দেখা গেছে। ফুটেজে তাকে পেছনের বাঁ পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিলেন কিনা- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকেরা। পুলিশ জানায়, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি তদন্তে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হয়েছিল কিশোরী। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি বাসে বুধবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ফেরে সে। রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে। এরপর একটি দোকানে মোবাইল চার্জ দেয় তাজমীন। রাত সোয়া ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে যায়। পরে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় ওঠে বলে পুলিশের ভাষ্য।
৪ থেকে ৭ অক্টোবর রাত পর্যন্ত মেয়েটি কিভাবে বিভিন্ন স্থানে গেছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ওই চারদিনে পরিবার থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়নি। ঘটনার পর কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেছিলেন, কিশোরী বুধবার রাতে বাসায় ফিরবে বলে ওই দিন বিকালে পরিবারকে জানিয়েছিল।
পুলিশ বলেছে, হত্যার পর অটোরিকশা ঘটনাস্থলে ফেলে আইফোন নিয়ে চলে যান সুমন। পরে কচিকাটা মসজিদের কাছে একটি পুকুরে গোসল করেন। এরপর অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রাখেন। পরে চট্টগ্রামে চলে যান। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই দিন বাখরাবাদ থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফোনটির বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কথা জানায় পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে; বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে।