যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক ব্যাংক অব আমেরিকাকে ১২১ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা করেছে দেশটির ট্রেজারি বিভাগ। অর্থপাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের এ জরিমানা করা হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এই পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের দাবি, ব্যাংকটি সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতি রেখেছে। এ ছাড়া ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সময়মতো কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। খবর আল জাজিরার।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বিবৃতি অনুযায়ী, ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেওয়া পদক্ষেপের মোট অঙ্ক ১২১ কোটি ডলারের বেশি। এর মধ্যে আর্থিক অপরাধ দমন নেটওয়ার্ক (ফিনসেন) ১২০ কোটি ডলার জরিমানা করেছে। অন্যদিকে, মুদ্রা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর (ওসিসি) জরিমানা করেছে ৭৫ কোটি ডলার এবং বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (ওএফএসি) নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলারের সমঝোতা ঘোষণা করেছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অধীন ফিনসেনের অভিযোগ, অর্থপাচার ও জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক অব আমেরিকার ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতি ছিল। এর মধ্যে চীনা অর্থপাচারকারী নেটওয়ার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অর্থায়নের ঝুঁকিও রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা, সেগুলো সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি এবং গ্রাহকের পরিচয় ও আর্থিক কার্যক্রম যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় ব্যাংকটির দুর্বলতা ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও কর্তৃপক্ষকে জানানোর দায়িত্বের উল্লেখযোগ্য অংশ তৃতীয় পক্ষের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল ব্যাংকটি।
ট্রেজারি বিভাগের দাবি, ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য ফিনসেনকে সময়মতো জানাতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংক অব আমেরিকা।
মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট বলেন, এত বড় একটি ব্যাংক অর্থপাচার প্রতিরোধ ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে পুরো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা অবৈধ অর্থের ঝুঁকিতে পড়ে।
স্কট বেসেন্ট আরও বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
ব্যাংক অব আমেরিকার অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচিকে অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর উল্লেখ করে ৭৫ কোটি ডলার জরিমানা করেছে মুদ্রা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর বা ওসিসি। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ জরিমানা।
তবে ফিনসেনের আরোপ করা ১২০ কোটি ডলারের জরিমানার মধ্যে ওসিসির জরিমানার অর্থ সমন্বয়ের সুবিধা রাখা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঘোষিত অঙ্ক সরাসরি যোগ করলে একই জরিমানার অংশ একাধিকবার গণনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রেজারি বিভাগের মতে, ব্যাংকগুলোর অর্থপাচার প্রতিরোধ কর্মসূচি কার্যকর রাখা এবং সন্দেহজনক লেনদেন যথাসময়ে শনাক্ত করা আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর বা ওএফএসি ব্যাংক অব আমেরিকার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির সম্ভাব্য লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলারের সমঝোতা ঘোষণা করেছে।
এসব কর্মসূচির মধ্যে ইরান ও রাশিয়াসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা, মাদক পাচার এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
ওএফএসি জানিয়েছে, ব্যাংকটি নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত মোট ৪৭৫টি সম্ভাব্য লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সম্মত হয়েছে। সমঝোতার অংশ হিসেবে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পরীক্ষা ও নিরীক্ষা এবং ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সবগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ওএফএসির ঘোষণায় এগুলোকে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জরিমানার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ব্যাংক অব আমেরিকা বলেছে, আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা তাদের কর্তব্য।
ব্যাংকটির বিবৃতিতে বলা হয়, আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং এ কাজে হাজার হাজার কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় কাজ অনেক দূর এগিয়েছে এবং তা সম্পন্ন করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বলেছে, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
