একটি ক্রিকেট বল কেড়ে নিয়েছিল তার চোখের আলো। শৈশবের চেনা পৃথিবী মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল অন্ধকারে। যে মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠতেন, সেই মাঠের স্মৃতি হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু নিয়তির এই নির্মম আঘাত তার স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি। চোখের দৃষ্টি হারিয়েও তিনি হারাননি জীবনের পথ খুঁজে নেওয়ার সাহস। বরং যে ক্রিকেট একদিন তার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছিল, সেই ক্রিকেটই আজ তাঁকে পরিচিত করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। শব্দের ভেতর দিয়ে বলের গতিপথ খুঁজে নেওয়া এই তরুণ এখন লাল–সবুজের পতাকা হাতে দেশের প্রতিনিধিত্বের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরাফাতুল ইসলাম ফয়সাল। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগরের এই তরুণ এবার দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্লাইন্ড ক্রিকেট এশিয়া কাপে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন। একই সাথে তিনি ডিজেবল স্টুডেন্ট সোসাইটি অব চিটাগং ইউনিভার্সিটি সংগঠনটির সভাপতি ও চিটাগং ডিজেবল স্পোর্টিং ক্লাবের (সিডিএসসি) অর্গানাইজিং সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
দৃষ্টিহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে তার এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা এক মানুষের আত্মপ্রত্যয়ের আখ্যান।
আগামী ১৪ থেকে ২৪ নভেম্বর বসুন্ধরা স্পোর্টস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিতব্য ব্লাইন্ড ক্রিকেট এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দলের অলরাউন্ডার হিসেবে খেলবেন আরাফাত। দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তার ক্রিকেটজীবনে যুক্ত করেছে নতুন অধ্যায়। পরিচিত মাঠে এবার তার লক্ষ্য নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেওয়া।
এর আগে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত ব্লাইন্ড টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমসেও বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ পদক জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
২০১১ সালের ২৮ মে। ফটিকছড়ির জাফতনগর লতিফ রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিলেন ছোট্ট আরাফাত। সেদিনের খেলা যে তার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেননি। খেলার একপর্যায়ে দ্রুতগতির একটি বল এসে আঘাত করে তার চোখে। সেই আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই চোখের রেটিনা। এরপর শুরু হয় চিকিৎসার দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অধ্যায়। দেশ–বিদেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েও স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাননি তিনি। ধীরে ধীরে নিভে আসে দুই চোখের আলো। তার পরিচিত পৃথিবী ঢেকে যায় অন্ধকারে।
যে বয়সে আরাফাতের সামনে থাকার কথা ছিল দুরন্ত শৈশব, সে বয়সে তাকে মেনে নিতে হয় জীবনের কঠিন বাস্তবতা। বদলে যায় দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষার পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার ধরন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর বেদনা জীবনে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবু সেই শূন্যতাকে জীবনের শেষ কথা হতে দেননি তিনি। অন্ধকারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টাও চলতে থাকে।
২০১২ সালে নগরীর সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা নানা বাধা তৈরি করলেও পড়াশোনা থেকে সরে দাঁড়াননি। সেই পথ পেরিয়েই আজ তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি সবকিছু সামলে এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে।
সাধারণ ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানের চোখ অনুসরণ করে বলের গতিপথ। বল কোথা থেকে আসছে, কত দ্রুত ছুটে যাচ্ছে, কোন দিকে ঘুরছে এসব বুঝেই তৈরি হয় ব্যাট চালানোর সিদ্ধান্ত। কিন্তু ব্লাইন্ড ক্রিকেটে দৃশ্যমানতার জায়গা দখল করে শব্দ। সেখানে কান হয়ে ওঠে চোখের বিকল্প, মনোযোগ হয়ে ওঠে পথচলার সঙ্গী, আর অনুশীলন তৈরি করে সাফল্যের ভিত।
ব্লাইন্ড ক্রিকেটে ব্যবহৃত বিশেষ বলের ভেতরে থাকে শব্দ সৃষ্টিকারী উপাদান। বলের শব্দ শুনে খেলোয়াড়রা তার অবস্থান ও গতিপথ বোঝার চেষ্টা করেন। সেই শব্দের ওপর নির্ভর করেই ব্যাট চালাতে হয়। ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও শব্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বোলিংয়ের সময় ব্যাটসম্যান প্রস্তুত কি না, তা নিশ্চিত করে নির্দিষ্ট মৌখিক সংকেতের মাধ্যমে বল করা হয়।
ভিন্নধর্মী এই ক্রিকেটের নিয়মের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন আরাফাত। শব্দের ভেতর থেকে বলের অবস্থান অনুমান করা, সঠিক সময়ে ব্যাট চালানো, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় নিবিড় মনোযোগ, ধারাবাহিক অনুশীলন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই দক্ষতাগুলো আয়ত্ত করেই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশ জাতীয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলের একজন অলরাউন্ডার।
আরাফাতের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটযাত্রা শুরু হয় ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় সিরিজে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার সামনে খুলে যায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা। এরপর ধীরে ধীরে জায়গা করে নেন বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলে।
২০২২ সালে ব্লাইন্ড ক্রিকেট টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রানার্সআপ হয়। ওই যাত্রায় তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমসে আবারও নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পান। সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দল ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় অর্জন করে। ভারতের বিপক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে তিন উইকেটে হেরে গেলেও সামগ্রিক পারফরম্যান্সে তৃতীয় স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। ফলে ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে দেশে ফেরে দলটি। এই অর্জনের অংশীদার ছিলেন আরাফাতও।
একদিকে ইতিহাস বিভাগের পড়াশোনা, অন্যদিকে জাতীয় দলের অনুশীলন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি; দুটি ভিন্ন জগতের দায়িত্ব একই সঙ্গে সামলাতে হয় আরাফাতকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে একাডেমিক অগ্রগতি ধরে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে নিজের দক্ষতা ও প্রস্তুতি অব্যাহত রাখাও তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। দৃষ্টিশক্তি না থাকার কারণে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজেও বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় তাকে। চলাফেরা, পড়াশোনা কিংবা খেলাধুলার প্রস্তুতি, প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় বাড়তি মনোযোগ ও সহযোগিতার। সময়ের সঙ্গে এসব বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। প্রতিকূলতা তার পথকে কঠিন করেছে ঠিকই, কিন্তু থামিয়ে দিতে পারেনি অগ্রযাত্রা।
আরাফাতুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, খেলাধুলায় সফল হতে হলে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিকূলতা যতই থাকুক, নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে দৃঢ় থাকলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। পরিবারের অনুপ্রেরণা, সতীর্থদের সহযোগিতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসা তার পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আগামী ১৪ থেকে ২৪ নভেম্বর বসুন্ধরা স্পোর্টস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিতব্য এই প্রতিযোগিতায় নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলের সাফল্যে অবদান রাখতে চান তিনি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্লাইন্ড ক্রিকেটকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠতে চান।
আরাফাতুল ইসলাম ফয়সাল সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্–ফোরকান বলেন, আমরা অবশ্যই এমন মেধাবী কৃতি শিক্ষার্থীর পাশে থাকব এবং তাকে সব বিষয়ে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকর।

