আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রকৃতির এক অদ্ভুত পরিবর্তনের সাক্ষী থাকছে পৃথিবী। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে ক্রমশ বদলে যাচ্ছে সমুদ্রের রং। একসময় যে জলরাশি সবুজ আভায় ঝলমল করত, সেখানেই এখন দেখা যাচ্ছে গাঢ় নীল রং। নাসার উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবিতে ধরা পড়েছে এই পরিবর্তন। বিজ্ঞানীদের মতে, এর পিছনে অন্যতম কারণ এল নিনোর প্রভাব। আশঙ্কা করা হচ্ছে, শক্তিশালী সুপার এল নিনো আগামী কয়েক মাস এবং ২০২৭ সাল জুড়ে বিশ্বের আবহাওয়ায় বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে।
২০২৫ সালের উপগ্রহচিত্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক ছবির তুলনা করলেই এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বছর প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রের জল স্বাভাবিক সবুজ আভা ধরে রেখেছিল। কিন্তু চলতি বছরের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে সেই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশ নীল হয়ে উঠেছে। নাসার পেস (PACE) উপগ্রহের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের এই রঙের পরিবর্তন আরও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
কেন বদলে যাচ্ছে সমুদ্রের রং?
সমুদ্রের সবুজ আভার পিছনে রয়েছে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা সালোকসংশ্লেষকারী অতি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীব। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করে এবং সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসা পুষ্টিসমৃদ্ধ ঠান্ডা জল এই জীবগুলির বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুপ্রবাহ এবং সামুদ্রিক স্রোতের স্বাভাবিক ধরন ব্যাহত হয়। বাণিজ্যবায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, কখনও কখনও তার দিকও পরিবর্তিত হয়। ফলে সমুদ্রের গভীর থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ জল উপরে উঠে আসার প্রক্রিয়া বা আপওয়েলিং কমে যায়। খাদ্যের অভাবে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের সংখ্যা হ্রাস পায়। এর ফলেই সমুদ্রের সবুজ আভা ফিকে হয়ে জল আরও নীল দেখায়।
২০২৭ সালে বাড়তে পারে বিপর্যয়ের আশঙ্কা
এল নিনো হল এল নিনো সাদার্ন অসিলেশন (ENSO) নামে পরিচিত প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের একটি পর্যায়। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এই চক্রের পরিবর্তন ঘটে। এল নিনোর সময় দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল সংলগ্ন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ জল জমা হয়। এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার উপর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (NOAA) অক্টোবর মাসে অনুমান করেছে, ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশ। নাসার উপগ্রহের পরিমাপেও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমুদ্রের পরিবর্তনে বিপন্ন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র
এল নিনোর প্রভাব শুধু সমুদ্রের রং পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের সংখ্যা কমলে খাদ্যসংকটে পড়তে পারে মাছ-সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী। তাদের খাবারের সন্ধানে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে হতে পারে। এর ফলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং মৎস্যসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বছরের শুরুতেই উপগ্রহে ধরা পড়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরে কেলভিন তরঙ্গের উপস্থিতি। এই তরঙ্গ হাজার হাজার মাইল জুড়ে উষ্ণ জলকে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে নিয়ে যেতে পারে। এপ্রিলের গোড়ায় সেই তরঙ্গ পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়াতে শুরু করে। দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার বেড়েছিল। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে তা প্রায় ২০ সেন্টিমিটার কমেছিল।
বিজ্ঞানীদের কাছে এই উপগ্রহচিত্রগুলি তাই শুধু সমুদ্রের রঙের পরিবর্তনের ছবি নয়, বরং বিশ্ব জলবায়ুর সম্ভাব্য পরিবর্তন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তবে এল নিনোর চূড়ান্ত তীব্রতা এবং তার প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলির পর্যবেক্ষণের উপর।
https://www.youtube.com/watch?v=jNGYSN4KXPc
