ভোরের আলো যখন কুয়াশার পর্দা সরিয়ে বাংলার গ্রামকে জাগিয়ে তোলে, তখন জীবনও নতুন করে ছন্দ খুঁজে পায়। কোথাও তাঁতের মাকু তাল তোলে, কোথাও কুমারের চাকা ঘুরতে ঘুরতে মাটির নিঃশব্দ ভাষাকে রূপ দেয়, কোথাও বাঁশ-বেতের সরু ফালিতে জন্ম নেয় সংসারের প্রয়োজন,
এম. ডি জিয়াবুল
ভোরের আলো যখন কুয়াশার পর্দা সরিয়ে বাংলার গ্রামকে জাগিয়ে তোলে, তখন জীবনও নতুন করে ছন্দ খুঁজে পায়। কোথাও তাঁতের মাকু তাল তোলে, কোথাও কুমারের চাকা ঘুরতে ঘুরতে মাটির নিঃশব্দ ভাষাকে রূপ দেয়, কোথাও বাঁশ-বেতের সরু ফালিতে জন্ম নেয় সংসারের প্রয়োজন, আবার কোথাও নকশিকাঁথার বুকে সুঁই-সুতোর আঁচড়ে ফুটে ওঠে স্মৃতি, ভালোবাসা আর জীবনের রঙিন উপাখ্যান। এই দৃশ্যগুলো নিছক কর্মযজ্ঞ নয়; এগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির গভীরতম স্পন্দন। যে হাতের তালুতে লেগে থাকে মাটির গন্ধ, যে আঙুলে জমে থাকে রঙের ছোঁয়া, যে কপালে ঝরে পড়ে পরিশ্রমের ঘাম সেই হাতই একটি জাতির আত্মনির্ভরতার বীজ বুনে চলে নীরবে, নিরলসভাবে।
বাংলার সভ্যতার দীর্ঘ পথচলায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কখনো প্রান্তিক ছিল না। নদীর মতোই এরও একটি প্রবহমান ইতিহাস রয়েছে। মসলিনের বিস্ময়, জামদানির নৈপুণ্য, পাটের সোনালি ঐতিহ্য, মৃৎশিল্পের কোমল সৌন্দর্য কিংবা বাঁশ-বেতের শিল্পকর্ম পৃথিবীর বহু প্রান্তে বাংলার পরিচয় বহন করেছে। সময় বদলেছে, বাজার বদলেছে, প্রযুক্তি নতুন নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে; তবু মানুষের হাতে জন্ম নেওয়া শিল্পের আবেদন মুছে যায়নি। যন্ত্রের উৎপাদনে গতি আছে, মানুষের সৃষ্টিতে প্রাণ আছে। সেই প্রাণের স্পর্শই দেশীয় শিল্পকে অনন্য মর্যাদা দেয়।
গ্রামের একটি ছোট কর্মশালার ভেতর যে আলো জ্বলে, সেটি অনেক সময় জাতীয় অর্থনীতির বড় বড় পরিসংখ্যানেও ধরা পড়ে না। অথচ সেই আলোয় জেগে ওঠে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন। একজন তাঁতি যখন দিনের পর দিন সুতোয় রঙ মিশিয়ে একটি শাড়ি বুনে তোলেন, তিনি শুধু একটি পোশাক তৈরি করেন না; তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, নান্দনিকতা এবং জীবনের গল্পও বুনে দেন। একজন কুমার যখন মাটির দলাকে কলস বা প্রদীপে রূপ দেন, তখন সেখানে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় সভ্যতার স্মৃতি। একজন নারী যখন নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ে রঙিন ফুল ফুটিয়ে তোলেন, তখন তাঁর শিল্প সংসারের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারও বহন করে।
এই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষ। সীমিত পুঁজি, অল্প জায়গা আর অক্লান্ত শ্রমকে সঙ্গী করে হাজারো উদ্যোক্তা প্রতিদিন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তাঁদের অনেকের পথ সহজ নয়। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, সহজ ঋণের অভাব, বাজারের অনিশ্চয়তা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার তাঁদের সম্ভাবনাকে বারবার থামিয়ে দেয়। অনেক সময় উৎকৃষ্ট পণ্যও সঠিক বাজার খুঁজে পায় না। দক্ষ কারিগরের হাতে গড়া শিল্প ন্যায্য মূল্য না পেলে সেই শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। একটি পেশা বিলীন হলে একটি ঐতিহ্যও নিঃশব্দে ম্লান হয়ে যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের নতুন অধ্যায় রচনা করেছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। অসংখ্য নারী ঘরের ভেতর থেকেই সৃজনশীলতাকে আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন। তাঁদের হাতে তৈরি প্রতিটি পণ্যে জড়িয়ে থাকে সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং আত্মমর্যাদার দীপ্তি। এই শক্তিকে আরও বিকশিত করতে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, সহজ ঋণ এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একজন নারী উদ্যোক্তার সাফল্য একটি পরিবারের সীমা অতিক্রম করে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করে।
বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। পরিবেশবান্ধব ও হস্তনির্মিত পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে মানসম্পন্ন উৎপাদন, আধুনিক নকশা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, আকর্ষণীয় উপস্থাপন এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিপণনকে আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত গ্রামের একজন কারিগরের তৈরি পণ্যও সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারে।
রাষ্ট্রের নীতিগত সহায়তা ছাড়া এই সম্ভাবনা পূর্ণতা পাবে না। সহজ শর্তে ঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, রপ্তানি সহায়তা এবং বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও উদ্যোক্তা তৈরির সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হবে, যাতে তরুণেরা কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সাহসী হয়ে ওঠে।
একটি হাতে বোনা শাড়ি, একটি মাটির প্রদীপ, একটি বাঁশের ঝুড়ি কিংবা একটি নকশিকাঁথা, এসবের মূল্য টাকার অঙ্কে শেষ হয় না। এগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, ইতিহাস, শিল্পবোধ এবং মাটির প্রতি ভালোবাসা। যে জাতি নিজের কারিগরকে সম্মান করতে জানে, সে জাতি নিজের সংস্কৃতিকেও রক্ষা করতে পারে। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন শহরের উজ্জ্বল আলোর সঙ্গে গ্রামের কর্মব্যস্ত উঠোনও সমান মর্যাদা পায়।
বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে দাঁড়িয়ে। এই সম্ভাবনাকে টেকসই শক্তিতে রূপ দিতে হলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। যে হাত সুতোয় রঙ মেশায়, যে হাত মাটিকে শিল্পে রূপ দেয়, যে হাত বাঁশের শরীরে সৌন্দর্যের রেখা আঁকে, সেই হাতই আগামী বাংলাদেশের সমৃদ্ধির স্থপতি। সেই হাতকে শক্তি দেওয়া মানে অর্থনীতিকে শক্তি দেওয়া, সেই হাতকে মর্যাদা দেওয়া মানে ইতিহাসকে সম্মান করা, আর সেই হাতকে এগিয়ে নেওয়া মানে আত্মনির্ভর, সৃজনশীল ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নকে আরও উজ্জ্বল করে তোলা।
লেখক: কবি ও ছড়াকার, কলামিস্ট।
