মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চললেও পটুয়াখালীর দুমকির নদীগুলোতে থামছে না ইলিশ শিকার। নিয়মিত অভিযান, জেল-জরিমানা ও অবৈধ জাল জব্দের পরও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাছ ধরছেন একশ্রেণির জেলে।
নদীতে অভিযানের ট্রলার দেখামাত্রই দ্রুতগতির ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পালিয়ে যাচ্ছেন তারা। ধাওয়া করেও জেলেদের আটক করতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত জাল জব্দ করেই ফিরতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) উপজেলার আলগি এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তারা জানান, পায়রা নদীতে পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের অভিযানের ট্রলার দেখেই দ্রুতগতির নৌকা নিয়ে পালাতে শুরু করেন জেলেরা। অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরা সর্বোচ্চ গতিতে ধাওয়া করেও তাদের নাগাল পাননি। একপর্যায়ে কয়েকজন জেলে নৌকা ও জাল তীরে ফেলে পালিয়ে গেলে মৎস্য বিভাগের কর্মীরা পরিত্যক্ত জাল জব্দ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে ব্যবহৃত ট্রলারের তুলনায় জেলেদের নৌকার গতি বেশি হওয়ায় বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীরা। বিশেষ করে গভীর রাতে এবং প্রশাসনের টহল শেষ হওয়ার পর পায়রা, লোহালিয়া ও পাণ্ডব নদীর বিভিন্ন এলাকায় ইলিশ শিকার চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফারুক হাওলাদার বলেন, ‘নদীতে প্রশাসন আর জেলেদের মধ্যে যেন চোর-পুলিশ খেলা চলছে। অভিযানের ট্রলারের গতি সম্পর্কে জেলেদের ধারণা রয়েছে। তাই তারা হালকা ও শক্তিশালী ইঞ্জিনচালিত নৌকা ব্যবহার করছেন। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেলেই দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গভীর রাতে এবং টহল শেষ হওয়ার পর মাছ ধরার প্রবণতা বেশি।’
উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে নদীতে অভিযান পরিচালনা করছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলমান অভিযানে এ পর্যন্ত ছয় জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চারটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, একটি ট্রলার এবং লক্ষাধিক মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা জাল প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা কালবেলাকে জানান, পেশাদার জেলেদের পাশাপাশি কিছু মৌসুমি জেলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরছেন। নদীর দুর্গম এলাকা ও শাখা নদীগুলোতে নজরদারি তুলনামূলক কম থাকায় তারা এ সুযোগ নিচ্ছেন। এতে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জেলেদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া অনেক জেলে পরিবার আর্থিক সংকটে রয়েছে। সরকারি খাদ্যসহায়তা পেলেও তা দিয়ে সংসারের সব খরচ মেটানো কঠিন বলে জানিয়েছেন তারা। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পাশাপাশি জেলেদের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, জেলেদের দ্রুতগতির নৌকার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো নৌযান ও পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া অভিযান পুরোপুরি সফল করা কঠিন। মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞার বাকি দিনগুলোতে নদীতে টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
দুমকি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘জনবল সংকট, বাজেট স্বল্পতাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মা ইলিশ সংরক্ষণে সাধ্যমতো চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সীমিত সামর্থ্যের কারণে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব না হলেও অভিযান মোটামুটি সফল হচ্ছে।’
