বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ, অব্যাহতি কিংবা বহিষ্কারের ঘটনা নতুন নয়। কখনো গণঅভ্যুত্থানের চাপে সরকারপ্রধানকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে, কখনো দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগে পদ ছেড়েছেন মন্ত্রী ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান। আবার কখনো ব্যক্তিগত বা শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন কেউ কেউ।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকারের আট মাসের মধ্যে তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যের বিদায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি এখন আরও আলোচিত।
আট মাসে বিএনপির তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কার কীভাবে বিদায়
- ইশরাক হোসেন: মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক
সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর ২০২৬ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেয়ার সময় তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযানের সময় ইশরাক ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতে অস্ত্র দেখা যায়। ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এরপর সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক।
- দীপেন দেওয়ান: অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ১ জুন ২০২৬ পদত্যাগপত্র জমা দেন। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মাথায় তার এ সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানানো হয়।পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। এর ফলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বজায় রাখার স্বার্থে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
- জহির উদ্দিন স্বপন: মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর রাজনৈতিক উপদেষ্টাতথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ২২ আগস্ট ২০২৬ পদত্যাগ করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছেন বলে জানানো হয়। একই দিনে তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগের দিন আন্দালিভ রহমান পার্থকে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
- পদত্যাগের নির্দেশে সংসদ সদস্যের বিদায়বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি গত ১ অক্টোবর ২০২৬ পদত্যাগ করেন। রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।
অতীতের আলোচিত পদত্যাগ ও বহিষ্কারের ঘটনা
- শেখ হাসিনা: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বিক্ষোভ এবং পরবর্তী সময়ে অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল।
- হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ: গণআন্দোলনে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করেন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার কাছে। ১৯৮২ সালে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রায় আট বছর ধরে তার শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন আন্দোলন চালায়। শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত আন্দোলনের চাপে তার শাসনের অবসান ঘটে।
- মো. সাহাবুদ্দিন: শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগরাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬ শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে জমা দেয়া পদত্যাগপত্রে তিনি স্বাস্থ্যগত জটিলতা ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।পরে পদত্যাগের বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরে দাঁড়ানোর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
- তাজউদ্দীন আহমদ: শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মন্ত্রিত্ব ত্যাগমুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।
- এস কে সিনহা: প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ২০১৭ সালে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপোড়েনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগ আলোচনায় আসে। ছুটি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। সে সময় সরকারের চাপের অভিযোগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
- সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারি২০১২ সালে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত সহকারীসহ কয়েকজনের একটি গাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। অর্থটি রেলে নিয়োগে ঘুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা নিয়ে অভিযোগ ওঠে।ঘটনার পর ১৬ এপ্রিল রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন সুরঞ্জিত। পরে তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে রাখা হয়।
- ড. আতিউর রহমান: রিজার্ভ চুরির পর গভর্নরের পদত্যাগ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগ আলোচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তাৎক্ষণিক তথ্য প্রকাশ ও সরকারের কাছে বিষয়টি জানাতে বিলম্ব নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়।১৫ মার্চ ২০১৬ তিনি গভর্নরের পদ ছাড়েন। পরে তিনি নিজের পদত্যাগকে স্বেচ্ছায় নেয়া সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন।
- আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: হজ নিয়ে মন্তব্যে মন্ত্রিত্ব হারান২০১৪ সালে হজ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। তার মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।তিনি পদত্যাগ না করায় ১৩ অক্টোবর ২০১৪ মন্ত্রিত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একই ঘটনায় আওয়ামী লীগের দলীয় পদও হারান তিনি। এ কারণে তার ঘটনাটি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের নয়, বরং পদ থেকে বহিষ্কারের উদাহরণ।
- জাহাঙ্গীর আলম: দল থেকে বহিষ্কার, পরে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত
২০২১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দলীয় ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ১৯ নভেম্বর তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ২৫ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
- মুরাদ হাসান: ফাঁস হওয়া ফোনালাপের পর পদত্যাগ২০২১ সালে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ওই কথোপকথনে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ও একজন সাংবাদিককে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
