তৃতীয় পর্ব
ডাইনিংরুমে ঢুকতে দরজার বাঁদিকে ছিল একজোড়া মোটা সাদা সুয়িং ডোর। সেটি খুললে সেগুলো বেশ জোরে আওয়াজ হতো। এই দরজাই ছিল পরিবারের একটা সীমানা। এর একদিকে থাকত বড়রা, অন্যদিকে ছোটদের আর বাড়ির কাজের লোকদের থাকার ব্যবস্থা।
ভিক্টোরিয়া আমলের সেই বাড়িটির যে অংশে ডায়ানা আর আমি থাকতাম, সেটি ছিল মূলত বাড়ির কাজের লোকদের এলাকা। বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় আমাদের সম্পর্কটা ছিল তখনকার আর পাঁচটি অভিজাত পরিবারের মতোই। ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ওপর বাবার ছিল গভীর আস্থা। তাই তার সঙ্গে
আমাদের সম্পর্কটাও অন্যসব অভিজাত পরিবারের থেকে আলাদা কিছু ছিল না। তার নিজের শৈশবও কেটেছে একই ছন্দে, একই পরিবেশে। যদিও সেটা এই পার্ক হাউসে নয়, তার শৈশব কেটেছে দূর নর্দাম্পটনশায়ারে, স্পেন্সার পরিবারের ষোড়শ শতকের বিশাল প্রাসাদ–আলথর্পে। ষাটের দশকে যখন পুরোনো সামাজিক রীতিনীতি একের পর এক ভেঙে পড়ছিল, তখনো তিনি সেই পুরোনো জীবনধারাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছিলেন, ত্যাগ করেননি। বাবা আমাদের দেখলে সবসময়ই স্নেহের হাসি হাসতেন কিন্তু পুরোনো আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির প্রতি তার ছিল গভীর শ্রদ্ধা।
পার্ক হাউসে তিনি থাকতেন বাড়িটির বড়দের অংশে। অন্যদিকে ডায়ানা আর আমি বেশ ফুর্তিতেই দিন কাটাতাম বাড়ির কাজের লোকদের দিকটায়, নার্সারিও ছিল সেখানে। সেখানে আমাদের ছিল শোয়ার ঘর আর বাথরুম। বাথরুমটি আমরা ভাগ করে ব্যবহার করতাম আমাদের আয়ার সঙ্গে। বাড়ির এই অংশে আমাদের নার্সারি ছাড়াও ছিল রান্নাঘর, গৃহস্থালির কাজের ঘর এবং উনিশ শতকের সেই বিশাল বাড়িটির নানা জিনিস রাখার ঘর।
বাবার ওয়াইন সেলার যেমন সবসময় তালাবদ্ধ থাকত, বন্দুকঘরটিও তেমনই। এই দুটি ঘর ছাড়া পার্ক হাউসের বাকি সব জায়গায় আমাদের ছিল অবাধ যাতায়াত। শুধু একটা ব্যাপার মেনে চলতে হতো। সেটি হলো, বাড়িটির নিজস্ব ছন্দ।
স্কুলের সময়, আমরা ছোটরা খুব ভোরে উঠে নিজেদের বিছানা গুছিয়ে নিতাম। ডায়ানা নিজের ঘর এক্কেবারে ফিটফাট করে গোছাত। তার পর দেখত, আমি ঠিকমতো গোছাতে পারছি কি না! আমি পারছি না দেখলে সে এসে হাত লাগাত। আমরা আয়ার সঙ্গে নার্সারিতেই নাশতা করতাম। ঋতু অনুযায়ী পোরিজ অথবা সিরিয়াল, তার পর টোস্ট আর জ্যাম। বাবা বাড়িতে থাকলে, স্কুলে যাওয়ার আগে আমরা তার সঙ্গে দেখা করতাম। তিনি স্নেহভরে আমাদের দিকে তাকাতেন এবং প্রতিদিন একই প্রশ্ন করতেন, ‘কী ডায়ানা-চার্লস! আজ তোমরা কী কী করবে?’ আমরাও বলতাম, কী কী করব বলে ঠিক করেছি। আমাদের এক আয়া বলতেন, আমরা নাকি বড় বেশি চঞ্চল। হতে পারে, তবে আমাদের দুজনের মধ্যে ডায়ানাই কথা বলত বেশি।
তার পর স্কুলে যাওয়ার জন্য আমরা একসঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম। আশপাশের পরিবারের আরও চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমরা স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। পালা করে তাদের মায়েরা গাড়ি চালিয়ে সবাইকে স্কুলে নিয়ে যেতেন এবং ফিরিয়ে আনতেন। যখন আমাদের পরিবারের পালা পড়ত, তখন পরিবারের কোনো কর্মচারী গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতেন।
বড় বোন হিসেবে ডায়ানা আমাকে কতখানি ভালোবাসত তার একটা ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ছে। ঘটনাটি খুলে বলি–১৯৬৮ সালের সেপ্টেম্বর। আমার বয়স তখন চার। কিংস লিন শহরের সিলফিল্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার প্রথম দিন। প্রথম স্কুলে যাওয়ার উত্তেজনায় সেদিন বেশ তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠলাম। ডায়ানা তখন ওই স্কুলেই ওপরের ক্লাসে পড়ত। নাশতা সেরে স্কুলের গাড়িতে ওঠার জন্য তৈরি হলাম। রওনা দেওয়ার আগে আমরা দুজন পার্ক হাউসের বাগানে স্কুলের পোশাক পরে দাঁড়ালাম, বাবা ছবি তুললেন। আমাদের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো বাবা সবসময় ক্যামেরাবন্দি করতেন।
ডায়ানা সেই স্কুলে দুই বছর ধরে পড়ছে। তাই তার ক্লাস আমার চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ ওপরে। তার ক্লাসের শিক্ষিকা ছিলেন মিস লো। সেকেলে ধাঁচের প্রধান শিক্ষিকা। তবে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তার দরদ ছিল অতুলনীয়। অনেক বছর পরে মিস লো আমাকে বলেছিলেন, ‘সেদিন ডায়ানা ক্লাসে কিছুতেই মন বসাতে পারছিল না। তার ছোট ভাই নিচের ক্লাসে কেমন আছে, কী করছে-এই চিন্তায় সে অস্থির। ডায়ানার এমন উৎকণ্ঠা দেখে মিস লো শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘যাও না-গিয়ে একবার দেখে এসো ওকে!’
ডায়ানা আমার ক্লাসে চলে এল। এক পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে নিল, আমি কেমন আছি, কী করছি। তার পর ফিরে গেল নিজের ক্লাসে। প্রাণখোলা হাসি হেসে বলল ‘ও ঠিকই আছে!’ এরপর সে ক্লাসে মন দিল।
স্কুল ছুটির পর আমরা আবার গাড়িতে উঠতাম, আমাদের নামিয়ে দিয়ে যেত পার্ক হাউসে। সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা বা ঘোড়ায় চড়তে যাওয়ার তাড়া না থাকলে আমাদের সময় কাটত নার্সারিতে। সেখানেই বিকেলের চা খেতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলতাম। সেটা ছিল এমন এক সময়, যখন ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির নেশা বলে কিছু ঢোকেনি আমাদের জীবনে। মাঝে মাঝে স্কুলের বন্ধুরা বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসত, আমরাও কখনো-সখনো যেতাম তাদের বাড়ি। কিন্তু বেশির ভাগ সময় পার্ক হাউসে আমাদের দুই ভাইবোনের একসঙ্গে সময় কাটত। আমাদের দিন আবর্তিত হতো সেই নার্সারিকে ঘিরে, আর সবকিছুর হাল ধরতেন আমাদের আয়া।
সেই ছোটবেলায় আমাদের একের পর এক আয়া এসেছেন। তাদের প্রায় সবাই ছিলেন স্নেহশীল। তবে দুজন ছিলেন ভয়ানক! তারা ডায়ানা আর আমাকে বিষম শাস্তি দিতেন। যদিও বাবা-মা এসবের কিছুই জানতেন না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, মা-বাবার কাছে এ নিয়ে নালিশ জানানোর কথা আমাদের কখনো মনেও আসেনি। হয়তো ভাবতাম, বাবা-মা নিশ্চয়ই এসব জানেন। নইলে আয়ারা এমন করবে কেন!
এই দুই আয়ার প্রথম যে জন, তার মুখ ছিল একেবারে ক্ষুরের মতো ধারালো। গায়ের রং পাশুটে হলদে। কাঠের চামচ দিয়ে আমাদের হাতের তালুতে জোরে জোরে বাড়ি মারত। এটা ছিল তার ভারী পছন্দের কাজ। আমাদের হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে ধরতে বলত, তার পর কাঠের চামচ দিয়ে সপাং সপাং বাড়ি। ওহ্, কী যে ব্যথা লাগত! সে এমন জায়গাতেই মারত, যাতে দাগ পড়লেও সহজে চোখে না পড়ে। দ্বিতীয়জন ছিল আরও ভয়ংকর। তার মনে হলেই হলো যে ডায়ানা কিংবা আমি দুষ্টুমি করেছি। নার্সারির টয়লেটের বাইরের সাদা কংক্রিটের দেওয়ালে আমাদের মাথা সজোরে ঠুকে দিত। গোত্তা খেয়ে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করত, চারপাশটা যেন পাক খেত বোঁ বোঁ করে। এত ব্যথা লাগত যে তা বলে বোঝানো যাবে না।
কখনো কখনো ডায়নাকে আর আমাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দুজনের চুল মুঠো করে ধরত, তার পর ভয়ানক জোরে আমাদের দুজনের মাথা একসঙ্গে ঠুকে দিত। সেই আঘাত সইতে পারতাম না। দুজনেই কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়তাম। তবে হ্যাঁ, আমরা দুজনেই ছিলাম বেশ জেদি। যেটা আমাদের কাছে ঠিক বলে মনে হতো, তা থেকে একচুলও নড়তাম না। কারও কোনো কাজ অন্যায় বলে মনে হলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতাম।
মা যখন পার্ক হাউসে থাকতেন, তখন আমাদের দিকে নজর রাখতেন। একবার আমাদের দুই বড় বোন, সারাহ আর জেন ঘন ঘন পেটের অসুখে ভুগতে লাগল। মা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না, কেন এমন বারবার হচ্ছে। শেষে তিনি জানতে পারলেন, সেটা কোনো স্বাভাবিক অসুখ নয়। আয়া গোপনে তাদের জোলাপ খাওয়াচ্ছে। কী বিকৃত উদ্দেশ্যে, কে জানে! সত্যিটা জানার পর মা তাকে সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিলেন।
ডায়ানা আর আমার জীবনে সবচেয়ে প্রিয় আয়া ছিলেন স্যালি পার্সিভাল। ১৯৬৮ সাল থেকে দুই বছর তিনি আমাদের দেখাশোনা করেছেন। স্যালি ছিলেন বুদ্ধিমতী, মমতাময়ী ও যত্নশীল। তার রসবোধও ছিল চমৎকার। আমরা তার কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করতাম, আর সেজন্যই তাকে এত ভালোবাসতাম। আরও একটা ব্যাপার খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর তাদের দুজনের বাড়ির ভেতরে আমাদের যাতায়াত যে অস্বস্তিকর ছিল, স্যালি সেটাও সামলাতেন সুন্দরভাবে।
ডায়ানা আর আমার সেই শৈশব জীবনে স্যালি ছিলেন সত্যিই এক বিরাট আশীর্বাদ। আগের আয়াদের মতো কড়কড়ে ইউনিফর্ম নয়, তিনি সাধারণ পোশাকই পরতেন। ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে যখন আমাদের জানানো হলো যে স্যালি পার্ক হাউস ছেড়ে চলে যাবেন, তখন আমরা দুজনেই ভেঙে পড়েছিলাম। সে সময় ডায়ানার বয়স নয়, আমার সাত। তার মানে, নার্সারির জীবন পেরিয়ে এবার আমাদের বড় হওয়ার পালা। তাছাড়া ডায়ানার স্কুল বোর্ডিংয়ের জীবন শুরু হতে চলেছে, সে চলে যাবে স্কুল বোর্ডিংয়ে। চলবে...
ভাষান্তর: মলয় পাঁড়ে
