দুদিনের তুষারপাতে পথ ঢেকে গেছে হাঁটুসমান নরম বরফে। চারদিকে সাদা অন্ধকার। সামনে কয়েক পা দূরের দৃশ্যও স্পষ্ট নয়। হিমশীতল ঝোড়ো হাওয়া শরীরের ওপর আছড়ে পড়ছে বারবার। প্রতিটি পদক্ষেপে পা ডুবে যাচ্ছে বরফে। যে পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেই পথই যেন হারিয়ে গেছে তুষারের নিচে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ভালো ছিল না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে এজেন্সি আগেই অভিযান বাতিল করে দিয়েছিল। নির্দেশ ছিল, ফিরে যেতে হবে। কিন্তু ২৫ সেপ্টেম্বরের পরিকল্পিত আরোহণের আগের রাতে, অর্থাৎ মধ্যরাতে যাত্রা শুরু করলেন ইকরামুল হাসান শাকিল।
সামনে ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুস। উচ্চতা ৫ হাজার ৬৪২ মিটার। ককেশাস পর্বতমালার এই শৃঙ্গ এভারেস্টের তুলনায় অনেক নিচু, কিন্তু উচ্চতা দিয়ে যে সব পাহাড়ের কঠিনতা মাপা যায় না, এলব্রুস যেন সেটাই প্রমাণ করতে প্রস্তুত।
শাকিলের সামনে তখন দুটি পথ—ফিরে যাওয়া, অথবা অনিশ্চিত আবহাওয়ার মধ্যে আরেকবার চেষ্টা করা। তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলেন।
যে রাতে পথ হারিয়ে যাচ্ছিল
পরিকল্পনা ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে এলব্রুসের চূড়ায় পৌঁছানোর। কিন্তু সেদিন পুরো দিনই আবহাওয়া ছিল বিরূপ। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় এজেন্সি অভিযান বাতিল করে দলকে ফিরে আসতে বলে। তবু রাতের আবহাওয়া কিছুটা শান্ত হতে পারে, এমন পূর্বাভাস ছিল। সেই সম্ভাবনাটুকু নিয়েই সন্ধ্যায় আলোচনায় বসলেন শাকিল, তার সহআরোহী হিদার এবং গাইড অ্যালেক্স।
সিদ্ধান্ত হলো, একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। তিনজন বেরিয়ে পড়লেন। তাঁদের যাত্রা দেখে আরও দুটি দলও পথে নামল। কিন্তু পাহাড়ের বাস্তবতা পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলল না।
হিমশীতল ঝড়ো হাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠল। চারপাশে এমন অবস্থা যে চোখের সামনে কিছুই দেখা যায় না। বরফের ওপর দিয়ে হাঁটার বদলে যেন প্রতিটি পদক্ষেপে বরফের ভেতর থেকে নিজেকে টেনে তুলতে হচ্ছিল। সামনে কতটা পথ বাকি, কোথায় নিরাপদে পা রাখা যাবে, কোন দিকে এগোলে চূড়ার পথ পাওয়া যাবে—সবকিছুই হয়ে উঠছিল কঠিন।
এলব্রুস সম্পর্কে শাকিলের আগের সতর্কবাণী তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। যাত্রার আগে তিনি বলেছিলেন, উচ্চতা নিয়ে তাঁর বিশেষ দুশ্চিন্তা নেই; সাবধান থাকতে হবে পাহাড়ের আচরণ নিয়ে। সেই আচরণের কঠিনতম রূপই যেন সামনে এসে দাঁড়াল।
আবহাওয়া আরও খারাপ হলে অন্য দুটি দল ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু শাকিল, হিদার ও অ্যালেক্স থামলেন না। তাঁরা এগোতে থাকলেন। এক পা। তারপর আরেক পা। চারদিকে তুষারঝড়, সামনে অনিশ্চয়তা, পায়ের নিচে নরম বরফ। তবু তাদের যাত্রা চলল।
শাকিল জানতেন, এলব্রুসে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যায় না। তুষারঝড় উঠলে পথ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি পদক্ষেপের গুরুত্ব আলাদা। রাতের সেই আরোহণে কোনো নাটকীয় নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল না চূড়ায় পৌঁছানোর কোনো গ্যারান্টি। ছিল কেবল চেষ্টা করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি তখনও অজানা।
অবশেষে সাদা শূন্যতার ওপারে রাত পেরিয়ে সকাল হলো। তুষারাবৃত এলব্রুসের ওপর দিয়ে এগিয়ে চললেন তিনজন। প্রতিকূলতার মধ্যে একের পর এক পদক্ষেপ তাঁদের নিয়ে গেল লক্ষ্যের দিকে।
তারপর এল সেই মুহূর্ত। ২৫ সেপ্টেম্বর। দিনটি শনিবার। রাশিয়ার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টা। বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টা। ইকরামুল হাসান শাকিল পৌঁছে গেলেন ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায়। তার সঙ্গে ছিলেন সহ-আরোহী হিদার ও গাইড অ্যালেক্স। তিনজন একসঙ্গে দাঁড়ালেন ৫ হাজার ৬৪২ মিটার উঁচু শৃঙ্গে।
যে অভিযান আবহাওয়ার কারণে বাতিল হয়ে গিয়েছিল, যে পথে অন্য দুটি দল ফিরে গিয়েছিল, সেই পথ পেরিয়েই এলব্রুসের চূড়ায় পৌঁছালেন তারা।
পরে শাকিল এনটিভি অনলাইনকে বলেছিলেন, পাহাড় কখনো কখনো মানুষের শক্তি মাপে না। পাহাড় মাপে, বিরূপ পরিস্থিতিতেও একজন মানুষ কতদূর যেতে রাজি। কথাটির মধ্যে তাঁর নিজের অভিযাত্রার দর্শনই যেন লুকিয়ে আছে।
এই জেদ এক দিনের নয়
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাগচালা গ্রামে জন্ম শাকিলের। এলব্রুসের তুষারঝড়ের মধ্যে তার এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় তার আগের অভিযানের দিকে। ২০২৩ সালে নেপালের পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটারের গ্রেট হিমালয়া ট্রেইল হেঁটে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।
এরপর আসে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার থেকে হাঁটা শুরু করেন শাকিল। লক্ষ্য ছিল এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল মিলিয়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয় প্রায় এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ। যাত্রাপথে যমুনা নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার সাঁতরে পার হয়েছিলেন তিনি।
দীর্ঘ ৮৪ দিনের সেই ‘সি টু সামিট’ অভিযানের শেষে ১৯ মে পৌঁছান এভারেস্টের চূড়ায়। সপ্তম বাংলাদেশি হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন তিনি। কক্সবাজার থেকে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ—এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিল দৃঢ়তা, ধৈর্য আর লক্ষ্য থেকে সরে না আসার মানসিকতা।
এবার সেই একই মানসিকতার আরেক পরীক্ষা দিল এলব্রুস। যে অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে টার্কিশ এয়ারলাইন্স, জ্যাপ, জীবন ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশন এবং আলিয়া শিপিং লিমিটেড। এই অভিযানটি যৌথভাবে আয়োজন করে রাশিয়ান হাউজ ইন ঢাকা ও বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব।
শাকিল জানান, এভারেস্ট ও এলব্রুস, এই দুটি অভিযানের চ্যালেঞ্জ এক নয়। এভারেস্ট অভিযানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ধকল ছিল; এলব্রুসে সামনে এসে দাঁড়াল তুষারঝড়, দুর্বল দৃশ্যমানতা আর বরফে ঢাকা পথের অনিশ্চয়তা।
এলব্রুসের পেছনে আরও সাত চূড়ার স্বপ্ন
শাকিলের এবারের অভিযানের নাম ‘বাংলাদেশ-রাশিয়া ফ্রেন্ডশিপ অভিযান’। ১১ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির রাশিয়ান হাউসে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল জাতীয় পতাকা। ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা ছাড়েন তিনি। এলব্রুস ছিল তাঁর বড় স্বপ্নের দ্বিতীয় ধাপ।
সেই স্বপ্নের নাম ‘সেভেন সামিট’। সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ। পর্বতারোহণের জগতে এটি একটি সুপরিচিত ও কঠিন লক্ষ্য। ১৯৮৫ সালে মার্কিন অভিযাত্রী রিচার্ড ব্যাস প্রথম মানুষ হিসেবে এই সাত চূড়ায় পা রাখেন। শাকিলও সেই লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছেন, একেকটি শৃঙ্গ জয় করে। আর এলব্রুসের বরফে সেই সিদ্ধান্তেরই ছাপ রয়ে গেল। সেখানে তিনি এঁকে এলেন বাংলাদেশের গল্প।
