Published on
:
3 min read
পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
‘পথের পাঁচালী’-তে প্রবল অভাবের মাঝেও দুর্গাপুজোর দৃশ্যটি ছিল শৈশবের এক মধুর মুহূর্ত। দিদি দুর্গার মৃত্যুর পর অপু আর গ্রামে থাকেনি। সেই চেনা কাশবনের সারির পাশ দিয়ে রেলগাড়ি চড়েই লেখাপড়ার জন্য কলকাতায় এসে হাজির হয়েছিল অপু। অপুদের মতো মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে আজ দলে দলে হাজির হচ্ছে শহর-শহরতলির ঠিকানায়। পৃথিবী জুড়েই নগরায়ন হয়ে উঠছে অনিবার্য। আর সেই সূত্র ধরেই যে উৎসব বাঙালির জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল, তার বিবর্তন ঘটছে কোন পথে, সেটাও দেখা দরকার।
এর ফলে বিপন্ন হচ্ছে শহরের পাড়া সংস্কৃতি। শহরের জনঘনত্ব লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিগত কয়েক দশক ধরেই নগরায়েণের দাপটে এলাকার মানচিত্রের বদল ঘটে চলেছে। স্বাধীনতা-উত্তর কালে রাজ্যের শহরগুলির চরিত্র ছিল মূলত শিল্পকেন্দ্রিক। আর শহরতলি জুড়ে গড়ে উঠেছিল নিম্নবিত্ত উদ্বাস্তু কলোনি। কিন্তু এই শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির হাত ধরে শহরের বদলে তা হয়ে উঠেছে পরিষেবা-কেন্দ্রিক শহর। ফলে পুরোনো পাড়ার চেনা ছবি বদলে যেতে শুরু করল। পুরোনো একতলা-দোতলা বাড়ি ভেঙে গজিয়ে উঠতে শুরু করল বহুতলের সারি। এখন আবার বড় বড় ক্যাম্পাসে সুউচ্চ বহুতলের সারি তৈরি হচ্ছে প্রতিবেশী মানুষদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে। শহরে মানুষের বাসের ঠিকানা বাড়লেও সেই অর্থে বসতি তৈরি হচ্ছে না। শহরের সামাজিক সম্পর্কগুলোই দানা বাঁধতে পারছে না আত্মকেন্দ্রিক এক জীবনচক্রে বাধা পড়ে। পাড়ায় পাড়ায় একদা যে দুর্গাপুজোতে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে জোয়ার ছিল আজ সেখানে ভাটার টান। পুজো কিংবা উৎসব এখন জননির্ভর হওয়ার পরিবর্তে পুঁজিনির্ভর।
নগরায়ণ যেমন পাড়া সংস্কৃতিতে বদল এনেছে, তেমন এনেছে পুজো-অর্থনীতির পরিবর্তন। হাল আমলে বাজার অর্থনীতির ধাক্কায় ধীরে ধীরে এই উৎসব কিংবা পুজো এখন ‘ইভেন্ট’-এ বদলে যেতে চলেছে কিনা, এমন আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে! কর্পোরেট পুঁজির লক্ষ্য হয়ে উঠছে পুজো এবং উৎসব, তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থেই। কারন যত বেশি মানুষ উৎসবে অংশ নেয়, তত বেশি বাড়ে সংস্থার বিজ্ঞাপনী গুরুত্ব। উৎসবের মরসুমে রাজ্যের অর্থনীতিতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার যে বিপুল লেনদেন হয়, তার থেকেই বাণিজ্যের লাভের কড়ি ফিরে আসে ঘরে। এই খণ্ডিত নগরজীবনে যখন সর্বজনীন উদ্যোগে ভাটা পড়ছে, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ হচ্ছে এমন ধরনের কর্পোরেট উদ্যোগের হাত ধরেই। ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক পুঁজির হাত ধরে বারোয়ারি পুজোর বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে থিম পুজো। সেই থিম পুজোর মণ্ডপসজ্জার ক্ষেত্রেও ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। বিশেষত ফাইন আর্টস, ইন্টিরিয়র ডিজ়াইন, আর্কিটেকচার কিংবা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো বিভিন্ন বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে সৃষ্ট মণ্ডপগুলির শিল্পকর্ম দুনিয়ার মানচিত্রেও তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। উৎসব শেষে এই শিল্পকর্মের সংরক্ষণ জরুরি, উৎসবের স্মারক কিংবা ইতিহাসের অংশ হিসাবে। পাশাপাশি উল্লেখ্য, উৎসবের দিনগুলিতে শহরে পুলিশের ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা। অবৈধ পার্কিংয়ের রাশ টেনে এবং কড়া নিয়ন্ত্রণ এনে যে ভাবে রাজপথে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীর পথ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় সেটাও সম্ভবত গিনেস বুক অফ রেকর্ডস-এ উল্লেখ করার মতোই ঘটনা। তা থেকে স্পষ্ট যে শহরে রাস্তার পরিমাণ রাতারাতি না বাড়াতে পারলেও যান শাসন কঠোর করতে পারলেই শহরকে অনেকটাই যানজট থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব।
কিন্তু ভবিষ্যতে মন্ডপ তৈরির ক্ষেত্রে দর্শক সুরক্ষা কিংবা ‘ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট’-এর ক্ষেত্রে আরও উন্নত প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। চলমান ভিড়ের ঘনত্ব ড্রোন কিংবা সিসিটিভি ক্যামেরায় অনুমান করে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ প্রস্থানের কৌশল নির্ধারণ প্রয়োজন। ভিড় সামলানো শুধু পুলিশের তাৎক্ষণিক দক্ষতা কিংবা দর্শনার্থীদের শুভবুদ্ধি-নির্ভর হলে কুম্ভ মেলার মতো বিপদ নেমে আসতে পারে উৎসবের ভিড়ে। বিশেষত এখন ছবি তোলার অভ্যাস মানুষের জিনে ঢুকে পড়েছে! সবান্ধবে নিজ ‘সেলফি তোলার হিড়িক রেকর্ড সৃষ্টি করছে! এখন নতুন প্রজন্মের দর্শনার্থীরা বেশ কিছু সময় ধরে মণ্ডপে প্রবেশ প্রস্থানের পথে ‘রিলস’ তৈরি করে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের নীচের জনসংখ্যার অনুপাত দেশে সর্বোচ্চ হওয়ায় পুজোর দর্শনার্থীর সংখ্যা রেকর্ড গড়ছে প্রতি বছর। বাড়তি দর্শনার্থী এবং পুজো দেখার বাড়তি সময়, এই জোড়া ধাক্কায় ভিড়ের বহর বাড়ছে জনপ্রিয় মণ্ডপগুলিতে। এমন প্রেক্ষিতে মণ্ডপের প্রবেশ প্রস্থানের পথে বাড়তি প্রশাসনিক সতর্কতা জরুরি। সম্প্রতি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দুনিয়া জুড়ে যেমন প্রতিষ্ঠানের র্যাঙ্কিং প্রথা চালু রয়েছে তেমনটা এখন ঘটছে পুজোকে ঘিরেও। শিক্ষাই হোক কিংবা পুজো মণ্ডপ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই র্যাঙ্কিংয়ের পেছনেও থাকে বাণিজ্যের অঙ্ক। যাঁরা এমন মূল্যায়নে বিচারকের ভূমিকায় থাকেন, তাঁরা প্রতিটি মণ্ডপের সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতা উভয় বিষয়েই মূল্যায়ন করলে আখেরে ভবিষ্যতের উৎসব আরও নিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিচারকদের মাপকাঠিতে কেবল প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা সেরা প্রতিমা, সেরা মণ্ডপ ঘোষণা যথেষ্ট নয়, বরং তাদের সেই শংসাপত্রের সঙ্গে ভবিষ্যতের সর্তকতার ক্ষেত্রগুলির সবিশেষ উল্লেখ প্রয়োজন।
আর প্রয়োজন পুজোর সাবেকি ভাবনা অনুযায়ী ‘স্পন্সর’ থেকে দর্শক, নেতা থেকে আমলা, প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই অভিন্ন আচরণ বিধি পালন। ইতিমধ্যে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে চালু হয়ে গেছে ভিআইপি পাসের প্রথা। সেই পাস বিলি কিংবা বিক্রিতেও উঠে এসেছে দুর্নীতির যোগ। এই ভিআইপি পাসধারীরাই উৎসবের ভিড় এড়িয়েই বিকল্প পথে সহজেই মণ্ডপের লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে পারেন। সর্বজনীন উৎসবের আবহে দর্শনার্থীদের মধ্যে এমন বিভাজন কতটা কাঙ্খিত, সেটা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে! উৎসব শুরুর আগেই বিভিন্ন পুজোর উদ্যোক্তা এবং বাণিজ্যিক সংস্থার গাঁটছড়ায় ভিআইপি পাসের চুক্তি হয় বাণিজ্যিক স্বার্থকে বিবেচনায় রেখেই। ইউনেস্কোর হেরিটেজ তকমা পাওয়া উৎসবের ময়দানে এই বিভাজন না রাখাই শ্রেয়। যদি বিশেষ পাসের ব্যবস্থা রাখতেই হয়, তা রাখা হোক শুধু শারীরিক ভাবে অক্ষম মানুষদের জন্য এবং জরুরি নিরাপত্তায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য। পুজো মণ্ডপও যদি আভিজাত্য এবং বাণিজ্যের বিভাজন রেখায় বিভক্ত হয়, বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়ের ধারণাটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।
লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণবিদ্যার শিক্ষক
