রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরিত হচ্ছে বাংলাদেশ সচিবালয়। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে আয়োজিত মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, শেরেবাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে ৩১ একর জমির ওপর নির্মিত হবে নতুন সচিবালয়।
এই পুরো প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন এই সচিবালয়ে ২০২৯ সালে অফিস করা যাবে বলেও জানান তিনি। এর আগে বিকেলে সচিবালয়ে এই বৈঠক হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, মন্ত্রিপরিষদ নাসিমুল গনিসহ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।
তবে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বিদ্যমান সচিবালয়েই একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। সরকার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিবালয়ের পশ্চিম পাশের পরিবহন পুল ও জিপিওর জমি যুক্ত করে নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। গত মার্চের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সচিবালয়ের ভেতরে ২৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো কয়েকটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
পরে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ স্থগিত রেখে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা ও নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থাপত্য অধিদপ্তরকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সাবেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের পরিকল্পনা প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রীপরিষদ। এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে প্রকল্পের নকশাও প্রধানমন্ত্রী দেখেছেন এবং বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। সেসব পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সূত্রের খবর, সরকারের ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি রয়েছে বর্তমান সচিবালয় প্রাঙ্গণে। এই মন্ত্রণালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ১৮ লাখ বর্গফুট জায়গার মধ্যে। প্রস্তাবিত নতুন সচিবালয়ে প্রায় ৩০ লাখ বর্গফুট জায়গা থাকবে, যেখানে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংস্থান করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই নতুন সচিবালয়ে অফিস স্থানান্তর করতে চান বলে এ সংক্রান্ত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্তত দুই জন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে।
সূত্রের দাবি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার একাধিকবার সচিবালয় স্থানান্তরের চিন্তা করলেও সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো বর্তমান সচিবালয়ের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় দুটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এপ্রিলে সচিবালয়ের ভেতরে আরো একটি ২১ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উত্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী এতে অনুমোদন না দিয়ে শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
কী থাকবে নতুন সচিবালয়ে : প্রখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্য ঐতিহ্য বজায় রেখে প্রতিটি ভবন ১২ থেকে ১৪ তলাবিশিষ্ট বারোটি ভবন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় হতে পারে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নকশায় নতুন সচিবালয়ের চারপাশে একটি সার্কুলার বা চক্রাকার সড়ক থাকবে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ, জিমনেসিয়াম, নান্দনিক ফোয়ারা, সুপরিসর পার্কিং এবং কেন্দ্রীয় কনভেনশন সেন্টারসহ আধুনিক সব প্রশাসনিক সুবিধাই রাখা হচ্ছে এতে। স্থান সংকুলান ও আধুনিক কর্মপরিবেশের বিষয়ে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা বলেন, এখনকার মতো অফিসারদের প্রত্যেকের জন্য পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা থাকবে না। কেবল শীর্ষ দুই স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ রাখা হতে পারে। বাকিদের জন্য করপোরেট সংস্কৃতির আদলে উন্মুক্ত ফ্লোরে গ্লাস বা বোর্ড পার্টিশন ব্যবস্থা থাকবে। এতে কম জায়গায় স্বচ্ছন্দে অনেক বেশি কর্মকর্তা কাজ করতে পারবেন।
আন্দোলনে যাচ্ছে বাকৃবি : সরকারের এই স্থানান্তরের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের আয়োজনের পর তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ওই দিন শেকৃবির গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম সালাউদ্দিন এম চৌধুরী বলেন, এই মাঠের সবুজায়ন, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে আমরা সেখানে উচ্চতর কৃষি গবেষণা চালাতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা নয়, ঢাকার ফুসফুস রক্ষা করাও। এসময় তারা মাঠটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এই দাবিতে গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শেকৃবির গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম সালাউদ্দিন এম চৌধুরী বলেন, মাঠটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, ঢাকা ও দেশবাসীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও পরিবেশ বিষয়ক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে আমরা একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছি। মাঠের সবুজায়ন, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে সেখানে কৃষি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাই।
আমাদের লক্ষ্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা নয়, ঢাকার পরিবেশ সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখা। কৃষি রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থাপন করলে সেখানকার পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে মাঠটি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনার খবরে তাদের ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নামতে হয়েছে। দাবি মেনে নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে আরো কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে বলেন তিনি।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে টেকব্যাক শেকৃবি ল্যান্ড শীর্ষক কর্মসূচি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। ওই কর্মসূচি থেকে মাঠটি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তাদের দাবি, কৃষি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় জমির সংকটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া, গতকালকের মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার সিদ্ধান্ত হয়।
বিআলো/অর্নব