বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা জোরদারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের পর এবার এর কার্যকর বাস্তবায়ন, বাংলাদেশের পণ্যের জন্য জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরে এসব বিষয় প্রাধান্য পাবে। সফর উপলক্ষে দুই দেশের মধ্যে আটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতি চললেও তিন থেকে চারটি সই হতে পারে বলে জানা গেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা এবং ঋণের সুদহার নিয়ে আলোচনা হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সব অংশীদারের কাছ থেকে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পেতে আগ্রহী। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি প্রকাশের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
জানা যায়, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার জাপান। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধি বাড়লেও আমদানি-রপ্তানিতে ভারসাম্যহীনতা রয়ে গেছে। বাংলাদেশে জাপানের রপ্তানির বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, যানবাহন ও যন্ত্রাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে জাপানে প্রধানত তৈরি পোশাক, বোনা ও নিট পোশাক এবং চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৪১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ১ দশমিক ৯১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৫০৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, দুই দেশের বাণিজ্য বাড়লেও জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, জুতা, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তৈরি পোশাকে বড় সম্ভাবনা
জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান খাত তৈরি পোশাক। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে জাপানে প্রায় ১ দশমিক ১৮৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে জাপানের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। জাপানের ক্রেতাদের কাছে মান, সময়মতো সরবরাহ, পণ্যের বৈচিত্র্য ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন ক্রেতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাবসায়িক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু শুল্কসুবিধা পেলেই রপ্তানি বাড়বে না। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, নকশা ও উদ্ভাবন এবং জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি।
ইপিএতে কী সুবিধা মিলবে
বাংলাদেশ ও জাপান ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করে। এটি বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। চুক্তিতে পণ্য ও সেবাবাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, শুল্ক প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের ব্যাবসায়িক সম্পর্কের জন্য একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যের জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্যের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে শুল্কছাড় বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কীভাবে এবং কখন প্রয়োগ হবে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত ও কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, ইপিএ স্বাক্ষরিত হলেও জাপানের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর চুক্তিটি কার্যকর হবে। ফলে চুক্তি স্বাক্ষর এবং এর বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ইপিএ কার্যকর হলে রপ্তানিকারকদের জন্য বাজারে প্রবেশের শর্ত সহজ হওয়ার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম আরও সুস্পষ্ট হতে পারে। তবে চুক্তির সুবিধা কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের উৎসসংক্রান্ত শর্ত এবং রপ্তানি নথিপত্রের নিয়ম মেনে চলতে হবে।
জাপান থেকে কী আমদানি করে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও শিল্পপণ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাপান থেকে বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে যানবাহন ও যন্ত্রাংশ : নতুন ও পুনর্ব্যবহৃত গাড়ি এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। লোহা ও ইস্পাত : শিল্প ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ধাতব পণ্য। শিল্পযন্ত্রপাতি : উৎপাদন, বস্ত্র ও অন্যান্য শিল্পের যন্ত্রপাতি। বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সরঞ্জাম : উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্র ও উপকরণ। অন্যান্য শিল্পপণ্য : জাহাজ, যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রকৌশল পণ্য।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিট ও ওভেন পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এবং জুতা। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়ানোর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
অবকাঠামো ও মাতারবাড়ী বন্দরে সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। মেট্রোরেলসহ চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন এবং ঋণের শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব রয়েছে। মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ করে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আমদানি-রপ্তানি সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, আগামী ১০ বছরের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনের বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া। বন্দরটির সক্ষমতা, সড়ক ও রেলযোগাযোগ এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে আমদানি-রপ্তানিতে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিচালনব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সমন্বয়ের ওপর।
বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিও সফরের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ উৎপাদনশিল্প, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্¦ালানি, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন। এসব ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ এলে স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, জমি ও শিল্পসেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ। ইপিএর বিধানগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এসব ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার জন্য আরও সুস্পষ্ট কাঠামো পাওয়া যেতে পারে।
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর প্রেক্ষাপটে জাপানের মতো বড় বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ইপিএ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে জাপানি পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে শুল্কছাড় এবং সেবাবাণিজ্যে সুযোগ সম্প্রসারণের ফলে কিছু দেশীয় শিল্পে প্রতিযোগিতার চাপও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, চুক্তিটি সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিতে, চুক্তির সুফল পেতে শুধু বাজারে প্রবেশাধিকার নয়, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬-২৯ অক্টোবরের জাপান সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ তৈরি করছে। ইপিএ কার্যকর করার প্রস্তুতি, নতুন সমঝোতা স্মারক, অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা, কম সুদে ঋণ এবং জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়গুলো সফরের আলোচনায় থাকবে। তবে চুক্তির বাস্তব সুবিধা কত দ্রুত পাওয়া যাবে, নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ কত হবে এবং অবকাঠামো প্রকল্পে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের আলোচনার ফলাফল ও পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ-জাপান বাণিজ্যের পরবর্তী ধাপ শুধু আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করাই হবে দুই দেশের সামনে প্রধান লক্ষ্য।