সমাজে কে কতটা ভালো আছে, তার চেয়ে কে কতটা ভালো আছে বলে দেখাতে পারছে সেই প্রতিযোগিতাই ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। দামি পোশাক, নতুন মডেলের মুঠোফোন, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান কিংবা বিদেশভ্রমণ অনেকের কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। অথচ এসব অর্জনের পেছনে আয়, সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার বাস্তবতা কতটা শক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন কম। এভাবেই বিস্তৃত হচ্ছে দেখানোর অর্থনীতি, যেখানে সমৃদ্ধির চেয়ে সমৃদ্ধির প্রদর্শন গুরুত্বপূর্ণ; আর সেই প্রদর্শন বজায় রাখতে গিয়ে মানুষ নিজের আর্থিক স্থিতিকেই ঝুঁকিতে ফেলছে।
ভোগ মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। উপার্জনের অর্থে পছন্দের জিনিস কেনা কিংবা পরিবারকে নিয়ে আনন্দ করা দোষের নয়। সংকট তৈরি হয় তখন, যখন ব্যক্তিগত পছন্দ সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। প্রতিবেশীর নতুন গাড়ি, বন্ধুর দামি ফোন কিংবা আত্মীয়ের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন অন্যের মধ্যেও একই জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। তখন সামর্থ্য নয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাই ব্যয়ের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। মানুষ কী প্রয়োজন, তা বিবেচনার আগে ভাবতে শুরু করে অন্যরা কী ভাববে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। সেখানে সাধারণত জীবনের বাছাই করা সুন্দর মুহূর্তগুলোই দৃশ্যমান হয়। দামি খাবার, বিলাসবহুল ভ্রমণ কিংবা নতুন কেনাকাটার ছবি দেখে অনেকেই অন্যের জীবনকে নিজের সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু সেই চাকচিক্যের আড়ালে থাকা ঋণ, কিস্তি কিংবা আর্থিক অনিশ্চয়তা পর্দায় ধরা পড়ে না। ফলে তৈরি হয় অসম প্রতিযোগিতা অন্যের সাজানো সাফল্যের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা। এই তুলনা থেকে জন্ম নেয় অপ্রাপ্তির বোধ, যা অনেককে সামর্থ্যের বাইরে খরচ করতে প্ররোচিত করে।এর সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো ধার করা অর্থে স্বচ্ছলতার অভিনয়। ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, ব্যক্তিগত ঋণ, কিস্তিতে কেনাকাটা কিংবা পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা যায়। কিন্তু ভবিষ্যতের আয় আগাম ব্যয় করে বর্তমানের মর্যাদা রক্ষা করতে গেলে আর্থিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। একসময় বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা কিংবা জরুরি পারিবারিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে জীবন যত ঝলমলে, ভেতরে ততই বাড়তে পারে দেনার চাপ। যে সমৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে ধার করতে হয়, তা সমৃদ্ধি নয় আর্থিক অনিশ্চয়তার সাজানো মুখোশ।এই সংকটের বড় চাপ পড়ে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ সামলানোর পরও সামাজিক প্রত্যাশা মেটানোর চাপ থাকে। ঈদের পোশাক, বিয়ের আয়োজন, উপহার কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই লোকলজ্জা সামর্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। যে অর্থ সঞ্চয় হতে পারত, তা ব্যয় হয় সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টায়। ফলে জরুরি তহবিল গড়ে ওঠে না, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দুর্বল হয় এবং সামান্য আর্থিক ধাক্কাও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।তবে এই সমস্যার দায় শুধু ব্যক্তির অপচয়প্রবণতার নয়। সমাজও সম্পদ প্রদর্শনকে সাফল্যের মানদণ্ড বানিয়ে এই প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করে। দামি পোশাককে আভিজাত্য, বড় আয়োজনকে সামর্থ্য এবং দৃশ্যমান ভোগকে প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে দেখার প্রবণতা মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনামূলক সংস্কৃতি সেই চাপ বাড়ায়। অর্থাৎ দেখানোর অর্থনীতি কেবল বাজারের তৈরি নয়; সামাজিক স্বীকৃতির প্রচলিত ধারণাও এর জ্বালানি।এখানে মৌলিক প্রশ্নটি হলো, আমরা কি প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করছি, নাকি অন্যের চোখে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে? এই পার্থক্য বুঝতে না পারলে আয় বাড়লেও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কারণ আকাঙ্ক্ষার কোনো স্বাভাবিক সীমা নেই; একজনের অর্জন আরেকজনের কাছে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা করে। ফলে উপার্জন যতই বাড়ুক, প্রদর্শনের দৌড়ে স্বস্তি অধরাই থেকে যেতে পারে।এই প্রবণতা মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যক্তিগত আর্থিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, সামর্থ্য অনুযায়ী কেনাকাটা, জরুরি সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং অপ্রয়োজনীয় ঋণ এড়িয়ে চলার অভ্যাস জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারে লোকদেখানো আয়োজনের চাপ কমাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের উচিত আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানো এবং সাফল্যকে শুধু সম্পদ প্রদর্শনের মাধ্যমে বিচার না করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
সমৃদ্ধির প্রকৃত পরিচয় দামি ফোন, পোশাক কিংবা আয়োজনের জৌলুশে নয়; বরং প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা, সঞ্চয়ের নিরাপত্তা, ঋণ সামলানোর ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার মধ্যে। অন্যের চোখে ধনী দেখাতে গিয়ে নিজের জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো অর্জন নয়। যে সমাজে সামর্থ্যের চেয়ে প্রদর্শনের মূল্য বেশি, সেখানে মানুষ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি মর্যাদা কেনার প্রতিযোগিতাতেও নামে। প্রশ্ন হলো, সেই মর্যাদার দাম দিতে গিয়ে আমরা নিজেদের আর্থিক স্বাধীনতাই হারাচ্ছি কি না।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ
