শফিক সাহেব ভাবছে আজ সে অফিসে যাবে না। এই একঘেয়ে জীবন আর ভালো লাগে না। জীবনে কিছুটা বাড়তি স্বাদ প্রয়োজন। কিছুটা বাড়তি রং। লাল, নীল, বেগুনি। রংধনুর সাত রং। কিংবা তিনটি মৌলিক রং। যে রং দিয়ে যেমন খুশি তেমন রঙে সাজানো যাবে জীবন। তাই শফিক সাহেব ভাবছে আজ অফিস পালাবে সে। অফিস পালানো! ব্যাপারটা একটু কেমন যেন। শুনতে কিছুটা বেখাপ্পা শোনায়। তা শুনতে যেমন লাগে লাগুক, অফিস সে পালাবেই। কিন্তু অফিস পালানোর পরে বসের রিঅ্যাক্ট কেমন হবে? সেটাই চিন্তা করছে শফিক সাহেব। সে হয়তো ব্যাখ্যা চাইতে পারে।
- শফিক সাহেব কাজটা কি ঠিক হলো?
- কোন কাজটা স্যার?
- এই যে অফিস ফাঁকি দিলেন?
- এটাতো একটা মহৎ কাজ স্যার?
- মানে?
- স্যার পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষের মাঝে এ লক্ষণগুলো থাকে। এটা ঠিক অফিস ফাঁকি দেওয়া না। ভুলো মন বলতে পারেন।
- তার মানে আপনি ভুল করে অফিসে আসতে গিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছেন?
- ঠিক ধরেছেন স্যার। যেমন কলম্বাস ভারত আসতে গিয়ে ভুল করে আমেরিকা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা তেমনি স্যার। অফিসে আসতে গিয়ে ভুল করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলাম। শাশুড়ি বলেন তা এসেছোই যখন আজ থেকে যাও। আমি আর না করতে পারলাম না স্যার। গুরুজনের আদেশ। কী বলেন স্যার?
- আমি আর কী বলব? যা বলার আপনিই তো বলছেন।
- স্যার আপনি কাজী নজরুলের ঘটনা জানেন?
- কোন ঘটনা?
- ওই যে কবির বউ একদিন ভীষণ অসুস্থ।
- তো?
- হুম সেটাই বলছি স্যার। কবির বউ বললেন, যাও বাজার থেকে আমার জন্য ওষুধ নিয়ে আস। কবি বললেন, যথা আজ্ঞা। কবি বাজারে গেলেন। ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। এর মাঝে একটা গাড়িতে লেটোগানের দল যাচ্ছে কোথাও গান করতে। তারা কবিকে ডাকলেন। কোথায় বউ আর কোথায় ওষুধ। কবি চলে গেলেন গান করতে। তিন দিন এখানে সেখানে গান গেয়ে কবির হঠাৎ পতির কথা মনে হলো! স্যার আমার ব্যাপারটা তেমনি ঘটেছে। আসতেছিলাম অফিসে, ওদিকে ঘটে গেছে উল্টো।
আচ্ছা এ ধরনের উদাহরণে স্যার কি কনভিন্স হবে? শফিক সাহেবের অফিসে এক পিয়ন ছিল। অফিস ফাঁকি দেওয়ার পরের দিন তার কোনো না কোনো আত্মীয় মারা যেত। একবার সে প্রায় সাত-আট দিন অফিসে এল না। ওদিকে স্যার তো পুরাই ক্ষ্যাপা। এবার আর রক্ষা নেই বেচারার। একদম বরখাস্ত করে সার্ভিস বইয়ে লাল কালি দিয়ে বিষয়টা লিখে রাখতে হবে। তো সাত-আট দিন ফাঁকিবাজি করে সে অফিসে এল। এসেই বলল, স্যার কোথায়? স্যার তো ভেতরে। সে তো কুড়াল হাতে বসে আছে। আজ আপনার নিস্তার নাই। এটা শুনেই সে চুলগুলো হাত দিয়ে নেড়ে উষ্কখুষ্ক করে, একটা মলিন চেহারা নিয়ে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে স্যারের রুমে প্রবেশ করল। ঢুকেই সে কি কান্না। স্যার আমার অমুক আত্মীয় মারা গেছে। বড় ভালো লোক ছিল স্যার। আমি না গেলে তার পরিবার বিশাল বিপদে পড়ত। স্যা...র। তার কান্না দেখে স্যারও ঠিক থাকতে পারে না। আচ্ছা কাঁদবেন না। আমি আবার কারও কান্না সইতে পারি না। সব ঠিক হয়ে যাবে। যান অফিস করেন। সে কাঁদতে কাঁদতে স্যারের রুম থেকে বের হয়ে হাসিমুখে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
- স্যার সব ঠিক কইরা দিছি।
- কী ঠিক করলেন?
- সব স্যার। আর কোনো সমস্যা নাই। হাজিরা খাতাটা দেন স্বাক্ষর করি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com
যা হোক শফিক সাহেব আজ অফিস পালাবেই। যা থাকে কপালে। শফিক সাহেবের অবশ্য ছোটবেলায় স্কুল পালানোর অভ্যাস ছিল। ক্লাস করতে করতে ক্লান্ত। একঘেয়ে জীবন। অঙ্ক ক্লাসে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। নিয়ম করে শপাং শপাং বেতের বাড়ি খাওয়া। ইংরেজি ক্লাসে স্যারের হাতে গিট্টু খাওয়া, সমাজবিজ্ঞান ক্লাসে সাল তারিখ মনে না থাকায় কান মলা খাওয়া। এসব আর কত ভালো লাগে? তাই শফিক সাহেব মাঝে মাঝে স্কুল পালাত। মাঠ ঘাট পেরিয়ে একটা বিশাল বিলের মাঝে শান্ত পুকুর পাড়ে একাকী বসে থাকত। পুকুরের পাড়ে নানা রকমের গাছ। ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা মায়াময় পরিবেশ। কোথা থেকে যেন একঝাঁক বক ও পানকৌড়ির দল পুকুরে সাঁতার কাটত। ছোট ছোট মাছ পুকুরে কিলবিল করত। বক ও পানকৌড়ির দল মাছের লোভে কোন অজানা দেশ হতে এখানে এসে ভিড় করত তা শফিক সাহেবের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করত। শফিক সাহেব মাঝে মাঝে পুকুরে পা ডুবিয়ে দিত। মাছগুলো তার পা ঠুকরে দিত। কিছুটা সুড়সুড়ি লাগলেও বিষয়টা উপভোগ করত। টানা ক্লাসের মাঝে এ রকম এক আধটু স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার বিষয়টা মন্দ ছিল না। মনের বোঝা হালকা হয়ে যেত। তবে এ স্কুল পালানোর জন্য তাঁকে শাস্তিও পেতে হতো। তাঁর নাম হয়ে গেল স্কুল পালানো শফিক। কিন্তু আজ এত বছর পরে স্কুল পালানোর সঙ্গে অফিস পালানোর বিষয়টি শফিক সাহেব মেলাতে পারছে না। তবু আজ অফিস সে পালাবেই। তার নাম হবে অফিস পালানো শফিক। বিষয়টা ভাবতেই মনে কেমন জোশ আসে। একটা রোমাঞ্চ রোমাঞ্চ ভাব। আসলে জীবনে কিছুটা রোমাঞ্চ না হলে চলে না। শফিক সাহেব অফিস পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। হঠাৎ গিন্নি হন্তদন্ত করে রুমে প্রবেশ করে।
- তোমার স্যারের ফোন।
- স্যারের ফোন! এত সকালে!
শফিক সাহেব আজ এক ঘণ্টা আগে অফিসে আসতে হবে।
- কে..ন স্যা..র? শফিক সাহেব আমতা আমতা করে।
- মানে কী? আপনার মনে নেই আজ টেন্ডার ড্রপ। দ্রুত এসে সব রেডি করেন, নইলে একটা কেলেঙ্কারি বেধে যাবে।
- জ্বি...জ্বি স্যার।
শফিক সাহেব হতাশ। ছেলেবেলায় স্যারদের ফাঁকি দিয়ে স্কুল পালালেও বসদের ফাঁকি দিয়ে অফিস পালানো সত্যিই অসম্ভব।
*লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, শরীয়তপুর।
