ডঃ অনামিকা বিশ্বাস: চোদ্দ বছরের বনবাসের মাঝেই এক শরতে অশুভ শক্তির বিনাশে মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনায় শ্রীরামচন্দ্র করলেন অকালবোধন। ১০৮ নীল পদ্ম নিবেদনের ইচ্ছা থাকলেও যখন উপায় হল না, ভক্তিবশে রামচন্দ্র উদ্যত হলেন তাঁর কমলাক্ষ উৎসর্গ করতে। শেষে সেই ভক্তিভাবেই ধরা দিলেন মহামায়া। এ গল্প কমবেশি আমাদের সকলের জানা। আজ সে রামও নেই, সে যুগও নেই। তবে রয়ে গিয়েছে অকালবোধনের রেশ। মহামায়া যেখানে উমা কিংবা গৌরী। কিন্তু বাঙালি বাংলায় থাক বা প্রবাসে, সে ঘরের মেয়েকে ঘরে আহ্বান করবে না তা কি হতে পারে! আর যে শারোদোৎসবের উৎপত্তিই বিদেশের মাটিতে সে উৎসব তো সূচনালগ্নেই জানান দিয়েছে, মা সেখানেই আসেন যেখানে তিনি সন্তানের ডাক পান। অতঃপর ভারত মহাসাগরের তীরে যে পুজোর শুরু বেঙ্গলিজ ইন ডেনমার্কের (বি.আই.ডি) সদস্যবৃন্দের হাতধরে তা পৌঁছছে বাল্টিক সাগরের উপকূলেও। আর কি অদ্ভূত সমাপতন, গুটি গুটি পদক্ষেপে পথচলা শুরু করা স্ক্যান্ডেনিভিয়ার এই সর্ববৃহৎ দুর্গাপুজোর এবার ১৪ বছর। তাই বি.আই.ডি আয়োজিত এবছরের দুর্গাপুজোর (Durga Puja 2026) থিম “চোদ্দয় চিন্ময়ী।”
বি.আই.ডি-র দুর্গাপুজোর সূচনালগ্নের কথা, এক প্রবাসী বাঙালি দম্পতি কোপেনহেগেনের ফুলবাজারে পদ্মের খোঁজে দিশেহারা। ত্রাতাস্বরূপ এক ব্যক্তি হঠাৎ উদয় হয়ে তাঁদের বলেন, “পদ্ম এক্সপোর্ট করাতে হলে সবজি বাজারে গিয়ে খোঁজ নাও।” সবজি বাজারে ফুলের সন্ধান! কিন্তু অবাক দম্পত্তিকে সে যাত্রায় উদ্ধার করেছিল সেই সবজি মান্ডির ব্যবসায়ীরাই। সেই থেকে প্রতিবছর নিয়ম করে বি.আই.ডির পুজোয় এসে হাজির হয় বাছাইকরা ১০৮-টি পদ্ম। ঐ যে, মায়ের পুজার জোগাড় তিনি নিজেই করিয়ে নেন। মৃৎশিল্পী মোহনবাঁশি রুদ্রপাল ও প্রদীপ রুদ্রপালের হাতের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা প্রতিমা যা আজ থেকে ঠিক ১৪ বছর আগে বাংলার মাটি থেকে জলপথে উত্তর সাগর অভিমুখে পাড়ি দিয়েছিল, তা আজ বি.আই.ডির প্রত্যেক সদস্যের “home away from home” অনুভূতির আধার।
মাতৃবন্দনায় নিয়মাবলির যেমন কোন ত্রুটি রাখা হয় না, তেমনি নজর রাখা হয়, বাংলার ঐতিহ্যমাফিক যেন বজায় থাকে সর্বভূক্তিকরণ। বি.আই.ডি-র প্রতিষ্ঠালগ্নের অন্যতম সদস্য তথা পুরোহিত দেবর্ষি মুখার্জির ভাষায়, বাঙালির দুর্গোৎসব সর্বজনীন। অতএব, প্রবাসের মাটিতেও বাঙালিয়ানার সেই মূলমন্ত্রেই বিশ্বাসী বি.আই.ডি পরিবারের সকল সদস্যবৃন্দ। স্বামী বিবেকানন্দের মার্গ অনুসরণ করে আয়োজিত হয় কুমারী পুজোর, যাতে অংশ নিয়ে থাকেন লোকাল ড্যানিশ “গৌরী”ও। লিঙ্গসাম্যের অনন্য নজির গড়ে মাতৃবন্দনায় অংশ নেন মহিলা পুরোহিতরাও। এমনকি অষ্টমীর দুপুরের খাবার বিতরণের দায়িত্বও থাকে বি.আই.ডি-র মহিলা সদস্যদের নিয়ে গড়ে ওঠা ‘টিম অন্নপূর্ণা’।
তবে বাঙালিদের দুর্গাপুজো কোনওকালেই শুধুমাত্র পুজোর আবহে সীমাবদ্ধ নয়। পুজোর সাথে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক আবেগ। পুজোবার্ষিকীর আবেগ, খিচুড়ি লাবড়া-পায়েস কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আবেগ। সেপ্টেম্বর মাস বিদায় নেওয়ার আগেই, কোপেনহেগেনের ইঁতিউঁতি উত্তরে হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে যখন থেকে মাথা দোলাচ্ছে ড্যানিশ “কাশফুল”, শুভ্র নীল শরতের আকাশের মাঝে বিনা এক্সপোর্ট ট্যাক্সেই পেঁজা তুলোর ভেলা ভাসছে, ঠিক তখন থেকেই বি.আই.ডির সদস্যরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে পুজোর তোড়জোড়ে। প্রবাস বলে পূজাবার্ষিকী আসবে না, তা কি হয়! মোনালিসাদির (মোনালিসা মজুমদার) তত্ত্বাবধানে এবং সকল সদস্যের সৃজনশীলতায় রঙিন মলাটে ছেপে ওঠে আমাদের পূজাবার্ষিকী। পাশাপাশি আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে সকলে মেতেছে নাচ-গান-নাটকের মহড়ায়। গতবছর এখানের ক্ষুদেরা সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’ মঞ্চস্থ করে সকলকেই অবাক করেছিল বই কী! সারাবছর ড্যানিশ-ইংলিশের কচকচানির মাঝে এই পুজো পূর্ববর্তী সময়টা যেন তাদের শেকড়ের টানে সাড়া দেওয়ার সময়।
বাঙালি ঘরোয়া আড্ডায় রূপ পাওয়া আদ্যাশক্তির আরাধনা কিন্তু আজ কেবল পুজোর আবহেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বি.আই.ডি-র এই পুজো কোপেনহেগেনের বুকে সুচারুভাবে ছাপ ফেলেছে ডেনমার্ক ও ভারতীয় সংস্কৃতির আদান-প্রদাণে। বি.আই.ডির বর্তমান প্রেসিডেন্ট নবনীতা নন্দী ঘোষের বক্তব্যে, “বি.আই.ডি-র দুর্গাপুজো শুধুই বাঙালি ঐতিহ্যের ধারক-বাহক নয়, বরং এই তিনদিন পুজো মণ্ডপ হয়ে ওঠে ডেনমার্ক ও বাংলা তথা ভারতের মেলবন্ধনের তীর্থক্ষেত্র। আর তাতে শিলমোহর পড়ে ড্যানিশ কালচারাল ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর বেন্তে ওল্ফ ও ভারতের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে।” অপেক্ষা আর মাত্র কদিনের, তারপরেই হাজির হবেন জগৎজননী। ঢাকে পড়বে কাঠি, উলু-শঙ্খধ্বনিতে হবে মায়ের আগমন, সিঁদুরখেলা ও ধুনুচি নাচে মেতে উঠবে প্রবাসী বাঙালি-সহ আপামর কোপেনহেগেনবাসী।
