কিছুদিন আগেও যে ফুটপাত ছিল হকারদের দখলে, সেখানে এখন স্বচ্ছন্দে হাঁটছেন পথচারীরা। চলার পথে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগছে না, কোনো দোকানে ঢুকতে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না ক্রেতাদের। এই জনশান্তির চিত্র রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত এলাকার। স্থানীয়রা জানান, শুধু হাঁটার জায়গা নয়, জনসাধারণের নির্বিঘœ চলাচলের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এলাকার পরিবেশেও এসেছে পরিবর্তন।
সরেজমিন মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে বিভিন্ন সড়ক ধরে মিরপুর-১ ও মিরপুর-২ নম্বর, শাহ আলী মার্কেট এবং হোপ মার্কেটের দিকে এগোলে চোখে পড়ে এই পরিবর্তন। আগে যেখানে জামাকাপড়, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসতেন হকাররা, সেসব জায়গার বেশির ভাগই এখন ফাঁকা। মাথার ওপর নেই পলিথিন বা ত্রিপলের ছাউনি। প্রশস্ত ফুটপাত ও খোলামেলা সড়কে ফুটে উঠেছে নান্দনিক ঢাকার চিত্র।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদ অভিযানের পর এমন পরিবর্তন এসেছে। সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত থেকে শুরু করে ফায়ার সার্ভিস ভবন, মেডিনোভা হাসপাতাল, মিরপুর শপিং সেন্টার, শাহ আলী মার্কেট ও হোপ মার্কেটমুখী সড়কের বেশির ভাগ অংশ হকারমুক্ত।
ফুটপাতের এই পরিবর্তনে স্বস্তি পেয়েছেন পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানিরা। তারা জানান, আগে ফুটপাতে ভিড় থাকায় ক্রেতারা দোকানে ঢুকতে চাইতেন না। এখন পরিবেশ সুন্দর হয়েছে, মানুষ নির্বিঘেœ হাঁটাচলা করতে পারছে। এ অবস্থা বজায় থাকলে ঈদের সময়ও সুফল পাওয়া যাবে। একটি ফ্যাশন হাউসের স্বত্বাধিকারী বলেন, ফুটপাত বলে যে কিছু আছে, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। আগে মানুষের গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগত। এখন ভালোভাবে হাঁটাচলা করা যাচ্ছে। এক শিক্ষার্থী জানান, এখন রাস্তায় স্বচ্ছন্দে হাঁটাচলা করা যায়। সড়কটি যে এত বড় এবং পাশে হাঁটার জন্য ফুটপাত রয়েছে, আগে তা বোঝার উপায় ছিল না।
কিছু স্থান এখনো দখলে : ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে দেওয়ার পরও কিছু জায়গায় পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি। মিরপুর-১০ থেকে ফায়ার সার্ভিসের দিকে যাওয়ার সড়কে সিগারেট, ঝালমুড়ি ও মোবাইল ফোনের স্ক্রিন প্রটেক্টর বিক্রি করতে দেখা যায় কয়েকজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাকে। কোথাও পেঁপেসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি হচ্ছে। ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল পার্ক করে রাখার দৃশ্যও চোখে পড়ে। এ ছাড়া অলিগলিতে হকারদের পণ্য বহনের গাড়ি ও কাঠের কাঠামো পড়ে থাকতে দেখা যায়।
হোপ মার্কেট এলাকার একটি বাসার কেয়ারটেকার বলেন, আগে বাসার সামনে হকাররা বসতেন। তাদের সরানো কঠিন ছিল। এ জন্য লাইনম্যানদের ধরতে হতো। এখন হকার না থাকায় চারপাশ পরিষ্কার। ঈদের সময়ও যেন তারা আবার বসতে না পারে, সেই ব্যবস্থা থাকা দরকার। ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল রাখা প্রসঙ্গে বিক্রেতারা জানান, ওই সড়কের কয়েকটি ফ্যাশন হাউসে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতারা মোটরসাইকেল পার্ক করেন। ফলে হকারমুক্ত হলেও কিছু জায়গায় পথচারীদের চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে।
দখলমুক্ত রাখাই চ্যালেঞ্জ : ফুটপাতের এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগও রয়েছে। তাদের মতে, উচ্ছেদ অভিযানের পর ফুটপাত খালি রাখা যেমন জরুরি, তেমনি নিয়মিত তদারকি না থাকলে আবারও দখলদারেরা ফিরে আসতে পারে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে ক্রেতাদের চাপ বাড়লে নতুন করে হকার বসার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সিটি করপোরেশনের এদিকে নজর রাখা উচিত। ফুটপাত ও সড়ক যেন আবার অবৈধ দখলদারদের কবলে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও হকারের কারণে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় মিরপুর-১০ নম্বর থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। হকারমুক্ত পরিবেশ বজায় আছে কি না, তা দেখতে তিনি বিভিন্ন সময়ে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন বলে জানান।
ডিএনসিসি জানায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে শতাধিক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১ হাজারের বেশি অস্থায়ী অবকাঠামো অপসারণ এবং ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার ফুটপাত উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় সহ¯্রাধিক মামলাও হয়েছে।
মিরপুর-১০ থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাতের বর্তমান চিত্র নগরজীবনে জনসাধারণের চলাচলের জায়গার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলে মানুষ নিরাপদে ও স্বচ্ছন্দে হাঁটতে পারে, দোকানে ক্রেতাদের যাতায়াত সহজ হয়, সড়কের ওপর চাপও কমে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সাময়িক এই পরিবর্তনকে নিয়মিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থায়ী করা, যাতে ফুটপাতের অধিকার ফিরে পাওয়া মানুষকে আবারও দখল আর ভোগান্তির মধ্যে পড়তে না হয়।