যে কোনও দুর্দান্ত ছবির সিক্যুয়েল মানেই কিন্তু তার নামের সঙ্গে অলিখিতভাবে জড়িয়ে থাকে বিরাট ঝুঁকি। এবং সঙ্গে দর্শকের অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ তো আছেই। না-না করলেও প্রথম ছবি সাফল্যের মাপকাঠিতেই সিক্যুয়েলের প্রতিটি খুঁটিনাটির বিচার কিন্তু চলে জনতামহলে। তাই জনপ্রিয় ছবির সিক্যুয়েল তৈরিটা অনেক সময় নির্মাতাদের কাছে ক্যাল্কুলেটেড রিস্ক থাকে না মোটেই। এদিকে নন্দিতা রায় এবং শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বরাবরই কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসেন। ‘বহুরূপী-দ্য গোল্ডেন ডাকু’ ছবিই তার হাতেগরম প্রমাণ। আজ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে ‘বহুরূপী’র এই সিক্যুয়েল প্রমাণ করে দিল, এই কঠিন কাজটাও তাঁরা কত অনায়াসে করে ফেললেন!
পরিচালক জুটির এই ছবি দর্শকদের এমন এক অন্ধকার অথচ চনমনে দুনিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে অপরাধ আর বিবেকের দ্বন্দ্ব প্রায় হাত ধরাধরি করে ফিরে আসে বারেবারে। ঠিক-ভুলের মাঝে থাকা সুক্ষ্ম রেখাটা কখনও বড় স্পষ্ট হয়ে ওঠে কখনও বা এক পলকেই ফিকে হয়ে যায়। এককথায় ‘বহুরূপী-দ্য গোল্ডেন ডাকু’ ছবির গল্প এবং পরিচালনা যেমন স্বাদু তেমনই টানটান। জমাটি অথচ নির্মেদ।

অল্প কথায় বলে নেওয়ায় যাক গল্প। বিক্রম প্রামাণিক এখন আদালতে মুহুরির কাজ করে। আইনকানুনের পাঠ সে নিয়েছে এবং সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছে সে বহু বছর। ছ্যাঁচড়াপুরে থাকলেও তাঁর স্ত্রী ঝিমলি পকেটমারি ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর একজন সংসারী মহিলা। স্বামী ও তাঁদের একমাত্র সন্তান-ই তাঁর পৃথিবী। অন্যদিকে, অয়ন ব্যানার্জি একজন পুলিশকর্তা। খানিক 'হাবলা'। এই সহজ-সরল মানুষটিকে নিজের শরীর ও শাসনের পাশে বেঁধে ডান হাতের সঙ্গে বাঁ-হাতেও বিস্তর আয় করার জন্য বদ্ধপরিকর তাঁর স্ত্রী। অয়ন ধীরে-ধীরে 'মানুষ' হয় তাঁর স্ত্রীর নির্দেশে। তাঁর এই আরও সফল হওয়ার মিশনের মধ্যেই জড়িয়ে পড়ে বিক্রম। বলা ভাল, টেনেটুনে তাঁকে জড়িয়ে নেওয়া হয়। এবং তা করে অয়ন-ই। এরপর কীভাবে মুহুরির কাজ ছেড়ে ফের ‘বহুরূপী ডাকাত’ হয়ে উঠল বিক্রম এ ছবি যেমন বলে সেই গল্প, তেমনই বলে পুলিশ ও ডাকাতের এক দুরন্ত লুকোচুরির গপ্পো। এবং তার ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দেয় টানটান সাসপেন্স, বুদ্ধির কিসসা এবং গা-গরম সংলাপ। শেষপর্যন্ত ডাকাত ও পুলিশের বুদ্ধির খেলায় জিতল কে, সেই উত্তরের খোঁজেই কখনও সামান্য ঢিমে তালে কখনও বা দ্রুত লয়ে এগোয় এই ছবি। এর থেকে বেশি খোলসা করে ছবির গল্প বলে ফেললে নির্মাতাদের প্রতি তা অবিচার হবে।
আসা যাক, ছবির পারফর্মারদের কথায়। ‘বহুরূপী-দ্য গোল্ডেন ডাকু’র ম্যান অফ দ্য ম্যাচ শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পরিচালনার ভার সামলানোর পাশাপাশি তিনি যে অভিনয়েও দুরন্ত, সেকথা প্রমাণের দায় তাঁর না থাকলেও এ ছবিতে আরও একবার তা নীরবে অথচ স্পষ্ট করে জানান দিয়ে দিয়েছেন তিনি। আবেগের দৃশ্য হোক কিংবা ছল-চাতুরির—শিবপ্রসাদের চোখ যেন কথা বলেছে। একেকটা দৃশ্যে একেক রকম সুরে ওঠানামা করেছে তাঁর চোখের মণি থেকে চোখের কোণের ভাঁজ। ‘হাবলা’ থেকে শয়তানিতে শান দেওয়া ঘুষখোর ‘দারোগাবাবু’র ভূমিকায় যীশু অনবদ্য। শিবপ্রসাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে তাঁর অভিনয়। এ ছবিতে যে অভিনেতা হিসেবে তাঁর ঝুঁকি টা অনেক বেশি ছিল, তা বলাই বাহুল্য। কারণ এই ছবির প্রিকুয়েলে আবীর চট্টোপাধ্যায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রসায়নকে কুর্নিশ জানিয়েছিল জনতামহল। তবে এই পরীক্ষায় সসম্মানে লেটারমার্ক্স নিয়ে পাশ করেছেন যীশু সেনগুপ্ত। ‘মন্দার’-এর পর ফের একবার ধূসর, ক্ষমতালোভী এক মহিলার চরিত্রে সোহিনী সরকার। চোখের চাউনি, সামান্য ঠোঁট মুচড়ে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি এবং শরীরের লালসার ককটেল মিশিয়ে রেশমি তাই যখনই পর্দায় এসেছেন, দখল করেছেন!

কৌশানী মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য-ও নিজেদের চরিত্রে যথাযথ। চরিত্রের খাতিরে ‘স-স’ করে কথা বলাটা যে ‘ঝিমলি’ কৌশানী বেশ রপ্ত করেছেন তা বোঝা যায় যখন তাঁর মতো একজন গ্ল্যামারাস' অভিনেত্রীর মুখে এহেন উচ্চারিত শব্দে কথাবার্তা বলাটা একবারও আরোপিত বলে মনে হয় না। যত্ন করে নিজেদের তুলে ধরেছেন ছোট্ট ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করা কলাকুশলীরা। এই এতটুকু একটি চরিত্রে নিজের জাত চিনিয়েছেন অভিনেতা অম্বরীশ ভট্টাচার্য। এবং শেষপাতে সুস্বাদু রাবড়ির মতো যাঁর পারফরম্যান্স দর্শকমহলে মন ভরিয়েছে, তাঁর নাম রজতাভ দত্ত। পটের বাঙালিবাবু-দের মতো চেহারার সোনা ব্যবসায়ী ‘ধ্রুববাবু’র ভূমিকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রজতাভ। সাকুল্যে মাত্র মিনিট পনেরোর মতো গোটা ছবিতে তিনি রয়েছেন। সংলাপ যে অনেক, এমনও অভিযোগ নেই বিশেষ। তবে ওইটুকুর মধ্যেই তিনি যে খেলাটি খেলেছেন, তা এক্সট্রা টাইমে মরিয়া হয়ে মেসি-রোনাল্ডো যেমন খেলেন, তার সঙ্গে তুলনীয়। যেখানে সংলাপ নেই, গোটা শরীর দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি।

নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে গান ও আবহসঙ্গীত একটি ফ্যাক্টর। ক্যারেক্টার-ও বটে। ‘বহুরূপী-দ্য গোল্ডেন ডাকু’ও তাঁর থেকে আলাদা নয়। তবে গানের সংখ্যা একটু কমলে বরং আরও ঝরঝরে হত ছবির গতি। ছবির নামের সঙ্গে যেহেতু জড়িয়ে রয়েছে বহুরূপী শব্দটি তাই সহজেই অনুমেয় ছবির কালার প্যালেটের মতো বিশেষ নজর ছিল নির্মাতাদের। দর্শকও যে ছবিতে জুড়ে থাকা নানান মুডের সঙ্গে যথাযথ সঙ্গত করা হরক রকম রঙের ছোঁয়া টের পাবেন, তা হলফ করে বলা যায়।
এককথায়, বহুরূপী-র পর ‘বহুরূপী-দ্য গোল্ডেন ডাকু’ও পুজোর বক্স অফিসের বাজারে সোজা ‘বাপি বাড়ি যা’!
