মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৮৬ ডলারে উঠেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০১ দশমিক ৪১ ডলারে। গত শুক্রবারের (১৬ অক্টোবর) এই দরবৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রেন্টের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের। কারণ, দেশের পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও কৃষি খাতে জ্বালানির বড় ভূমিকা রয়েছে। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে সরকারকে জ্বালানি খাতে বেশি ভর্তুকি দিতে হতে পারে। আমদানির বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দাম, উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের বরাতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে গত মার্চ থেকে ছয় মাসে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সময়ে জ্বালানি পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ের ব্যয়ও বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণে উৎপাদন ও চাহিদার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বড় ভূমিকা রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে এবং জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ ঝুঁকিতে পড়লে সরবরাহ কমার আগেই বাজারে দাম বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির জায়গা হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এটি। এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকি বিমা, জাহাজভাড়া এবং বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ে।
সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করা সম্ভব। ফলে এই বিকল্প রপ্তানি পথের আশপাশে হামলার ঝুঁকি বাড়লে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনেও সৌদি আরবে হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা, উৎপাদন, মজুত ও বিকল্প সরবরাহের পরিমাণও তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কিনতে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানিতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে চাপ আরও বাড়ে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের পাশাপাশি এলএনজিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে গ্যাসের আন্তর্জাতিক মূল্য ও সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের মোট জ্বালানি আমদানি ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যেতে পারে।
এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৩ শতাংশ বেড়ে ১১৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। একই সময়ে তেলজাতীয় পণ্য ও লুব্রিক্যান্ট আমদানিতে ব্যয় বেড়েছিল ৮৪ শতাংশ, মোট ৭৮৯ কোটি ডলার। এই পরিসংখ্যান দেখায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ধাক্কা দেশের আমদানি ব্যয়ে কতটা বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিজেল বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন, কৃষি সেচ, নৌপরিবহন এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক, বাস ও পণ্যবাহী নৌযানের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয়ের কিছু অংশ পণ্যের দামে যুক্ত করলে চাল, ডাল, সবজি, মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রভাব একদিনে সব পণ্যে সমানভাবে পড়বে না। পরিবহনব্যয়, মজুত, মৌসুমি উৎপাদন, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং সরকারের মূল্য ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন পণ্যের দাম ভিন্নভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক জ্বালানির ভূমিকা রয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। আবার আমদানিনির্ভর এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাস সরবরাহের ব্যয়ও বাড়ে।
এর প্রভাব পড়তে পারে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, ইস্পাত, সিমেন্ট, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ জ্বালানিনির্ভর শিল্পে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দাম বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং সময়মতো পণ্য পাঠানোর চাপ একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও দেশের বাজারে দাম একই হারে না বাড়ালে আমদানিকারক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হতে পারে। সেই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হয় অথবা অন্য খাতের ব্যয় সংকোচন করতে হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ভর্তুকির কারণে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে এবং আমদানি ব্যয় বাড়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ পড়তে পারে। বিশেষত সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, এলএনজিও গুরুত্বপূর্ণ। কাতার থেকে এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালীর নিরাপদ চলাচলের ওপর নির্ভরশীল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহে বিঘ্নের কারণে কাতারএনার্জি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহের পরিকল্পিত পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা জানিয়েছিল। এর বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনা এবং অন্য দেশ থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা খুঁজতে হয়েছে। স্পট মার্কেটে দাম বেশি থাকলে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতেও বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বাড়াতে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কমাতে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে সংকট মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক জ্বালানি কেনার ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; আমদানি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সুরক্ষা এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস নিয়েও পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের জ্বালানি নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের মে মাসে অনুমোদিত অতিরিক্ত ৩৫ কোটি ডলারের অর্থায়নের লক্ষ্য ছিল এলএনজি আমদানিতে অর্থায়নের সুবিধা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য করা। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ অর্থনীতি সচল রাখা, শিল্পের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ মত হলো, শুধু আমদানির সক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। আমদানির উৎস, জ্বালানির ধরন এবং সরবরাহের পথ বহুমুখী করা প্রয়োজন।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম সতর্ক করেছেন, নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়াতে পারে। তার বিশ্লেষণে দেশীয় গ্যাসের কার্যকর ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক জলবিদ্যুতের মতো বিকল্পের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
