নবীজি (সা.) মদিনায় এসেছেন প্রায় তিন বছর। একটু একটু করে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ইসলামের বিস্তৃতি বাড়ছে। প্রায়ই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে ইসলাম গ্রহণ করছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধও সংঘটিত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
বদর যুদ্ধে মুসলিমরা নিরঙ্কুশ জয় লাভ করলেও ওহুদে কিছুটা বিপর্যয় ঘটে। কয়েকজন সাহাবির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে জয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়।
এই ঘটনায় কাফেরদের মনোবল ফিরে আসে। মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে তারা। তারই অংশ হিসেবে খালিদ ইবনে সুফিয়ান নামের এক ব্যক্তি নবীজিকে ঘায়েল করতে রণবাহিনী প্রস্তুত করতে থাকে।
মদিনা থেকে প্রায় সাড়ে চার শ কিলোমিটার দূরে উরানাহ ও নাখলা নামক উপত্যকার কাছে মদিনায় অতর্কিত হামলার ফন্দি আঁটে তারা। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৬০)
ষড়যন্ত্র নস্যাৎ
কিন্তু ঘটনা গোপন রইল না; নবীজির কানে সংবাদ পৌঁছে গেল। তৎক্ষণাৎ তিনি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসকে নির্দেশ দিলেন, যেন তিনি শত্রুকে প্রতিহত করার উদ্যোগ নেন। নির্দেশ অনুসারে তিনি ছদ্মবেশে নাখলায় উপস্থিত হলেন। নিজের পরিচয় গোপন রেখে খালিদকে বললেন, ‘তোমার বাহিনীতে যোগ দিতে চাই।’
পরে রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে খালিদের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ চাইলেন আব্দুল্লাহ। খালিদ তাঁবুর বাইরে এলে কথার ছলে কিছুটা নির্জনে নিয়ে তাঁকে অতর্কিত আঘাত হানেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৬০)
প্রতিশোধের কূটকৌশল
এ ঘটনায় খালিদের গোত্র বনু লাহিয়ান মুসলিমদের ওপর প্রতিশোধের আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু সম্মুখযুদ্ধের শক্তি বা সাহস—কোনোটাই না থাকায় তারা প্রতারণার আশ্রয় নেয়। পার্শ্ববর্তী আজাল ও কারাহ গোত্রের কিছু লোককে ঘুষ দিয়ে মদিনায় পাঠায়, যেন তারা নবীজির কাছ থেকে কোরআন শেখার অজুহাত দেখিয়ে কিছু সাহাবিকে ডেকে নিয়ে আসতে পারে।
নবীজি (সা.) সরল মনেই তাঁদের প্রস্তাবে রাজি হলেন এবং আসিম ইবনে সাবিতের নেতৃত্বে দশজন সাহাবিকে তাঁদের সঙ্গে পাঠালেন। এঁদেরই একজন ছিলেন খুবাইব ইবনে আদি (রা.)। সম্মতি পাওয়ামাত্রই গুপ্তচর মারফত তারা তাদের ফেরার পথ ও পদ্ধতি জানিয়ে সংবাদ পাঠিয়ে দিল বনু লাহিয়ানের কাছে। ফলে তারা আগে থেকেই ওঁত পেতে থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৮৯)
অতর্কিত আক্রমণ
জায়গাটি ছিল মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী ‘রাজি’ নামক একটি জলাশয়ের পাড়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সাহাবিরা ইতিমধ্যেই ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম ও পানি পানের আশায় তাঁরা এখানে যাত্রাবিরতি নিলেন। হঠাৎ করেই দুই শ অস্ত্রধারী লোক এসে ঘিরে ফেলল নিরস্ত্র সাহাবিদের। তবে তারা পিছু হটলেন না। শুরু হলো এক অসম যুদ্ধ।
আক্রমণকারীদের এক শ জন ছিল দক্ষ তীরন্দাজ। তীব্র মোকাবিলার একপর্যায়ে আসিম বিন সাবিত (রা.) সহ সাতজন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩/১৬৯-১৭৯, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ২০০১)
প্রতারণার শুরু
কাফেররা তখন বাকি তিনজনকে শপথ করে ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দেয় ও আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। এই তিনজন হলেন খুবাইব ইবনে আদি, জায়েদ ইবনে দাসিনাহ এবং আবদুল্লাহ ইবনে তারিক (রা.)। চোখের সামনে ভাইদের এমন নির্মম শাহাদাত দেখে তাঁরা এটাকে নিরাপদ মনে করলেন। কিন্তু আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গেই কাফেররা প্রতিশ্রুতি ভেঙে তাঁদের ধনুকের ছিলা বা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং মক্কার দিকে নিয়ে চলতে শুরু করে।
এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখে আবদুল্লাহ ইবনে তারিক (রা.) প্রতিবাদ করেন এবং নিজের বাঁধন ছিঁড়ে কাফেরদের ওপর চড়াও হন। তিনি বললেন, ‘গাদ্দারদের সঙ্গে যাওয়ার চেয়ে আমার জন্য শাহাদাতই উত্তম।’ পাথরের নিষ্ঠুর আঘাতে তখন শহীদ করে দেওয়া হলো তাঁকে। আর খুবাইব ও জায়েদকে নিয়ে যাওয়া হলো মক্কায় এবং পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বিক্রি করে দেওয়া হলো দাস হিসেবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৮৯)
শত্রুর সঙ্গেও মানবতা
খুবাইবকে কিনে নিলেন হারিস ইবনে আমিরের ছেলেরা, বদর যুদ্ধে যিনি নিহত হয়েছিলেন খুবাইবের হাতেই। আর জায়েদকে কিনলেন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, বদর যুদ্ধে যাঁর বাবা নিহত হয়েছিলেন আলী (রা.)-এর হাতে। সময়টা ছিল জিলকদ বা জিলহজ মাস—রক্তপাত নিষিদ্ধের সময়। তাই সিদ্ধান্ত হলো, পবিত্র মাস শেষ হলে তাঁদের হারাম শরিফের বাইরে নিয়ে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। ততদিন তাঁরা যার যার বাড়িতে লোহার শেকলে বন্দি থাকবেন।
খুবাইব (রা.) এই পুরো সময়টায় ছিলেন একদম ধীরস্থির ও শান্ত। মক্কার কোথাও যখন আঙুরের নামগন্ধও নেই, তখন একদিন দেখা গেল, আস্ত থোকা থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে আঙুর খাচ্ছেন তিনি, অথচ তাঁর হাত-পা শেকলে বাঁধা।
ফাঁসির আগের দিন তিনি হারিসের এক মেয়ের কাছে ক্ষুর চাইলেন; উদ্দেশ্য নিজেকে পরিপাটি করা। মেয়েটি তা এনে দিল। কিছু সময় পর এসে দেখল, তার শিশুপুত্র হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে বসে আছে খুবাইবের কোলে, আর খুবাইবের হাতে সেই ধারালো ক্ষুর। এই দৃশ্য দেখে মেয়েটি আঁতকে উঠল।
খুবাইব তার চোখের ভাষা ধরতে পেরে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমি বিশ্বাসঘাতক নই। আমার ধর্ম কোনো নিরপরাধ শিশুকে হত্যার অনুমতি দেয় না।’ এই বলে তিনি শিশুটিকে আলতো করে সরিয়ে দিলেন। সেই নারী পরে বলেছিলেন যে খুবাইবের মতো উত্তম বন্দি তিনি জীবনে দেখেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৮৯)
শেষ ইচ্ছা
ফাঁসির দিন খুবাইবকে পবিত্র হারাম সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। চারপাশে ভিড় করেছে মক্কার সব মানুষ, শাস্তির দৃশ্য দেখতে এসেছে তারা। খুবাইবকে যখন ফাঁসির কাষ্ঠে আনা হলো, তখন তিনি এক অদ্ভুত ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। বললেন, ‘তোমরা সুযোগ দিলে আমি দুই রাকাত নামাজ পড়তে চাই।’
কাফেররা ভারী অবাক হলো। এ-ও কি কারও শেষ ইচ্ছা হতে পারে? তারা সম্মতি জানাল। খুবাইব (রা.) অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে, পরম একাগ্রতার সঙ্গে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, তোমরা যদি না ভাবতে যে আমি মৃত্যুভয়ে নামাজকে লম্বা করছি, তাহলে আরও দীর্ঘ সময় নিয়ে আমি নামাজ পড়তাম।’
ফাঁসির কাষ্ঠে দরুদ ও দোয়া
এরপর কাফেররা তাঁকে কাঠের ক্রুশে বা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয় এবং চারদিক থেকে বর্শা দিয়ে খোঁচাতে শুরু করে। তীব্র আঘাত আর মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যেও খুবাইব (রা.) আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করলেন, আল্লাহুম্মা ইন্নি লাসতু আরা ইল্লা ওয়াজহা আদুওয়্যিন, আল্লাহুম্মা আবলিগ রাসুলকা মিন্নিস সালাম। (হে আল্লাহ, এখানে শত্রু ছাড়া আমার আর কেউ নেই; আপনি আপনার রাসুলের কাছে আমার এই শেষ সালামটি পৌঁছে দিন।’ (আল-ওয়াকিদি, কিতাবুল মাগাজি, ১/৩৫৭, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ১৯৮৯)
অলৌকিক ব্যাপার হলো, সুদূর মদিনায় বসেই রাসুল (সা.) এই সালাম শুনতে পান এবং সাহাবিদের বলেন, ‘তোমাদের ভাই খুবাইবের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, কোরাইশরা তাঁকে শহীদ করে দিয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০৪৫)
