‘বাবা কই, কখন আসবে মা’— চার বছরের রিদিতা আর দুই বছরের সাইফানের এমন প্রশ্নে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা। অবুঝ দুই শিশু জানে না, তাদের বাবা আর কখনও ফিরবেন না। যে বাবা তাদের আদর-ভালোবাসায় আগলে রাখতেন, সেই বাবাকে হারিয়ে পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। ব্যবসার কাজে রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন ওই দুই শিশুর বাবা জুয়েল মাদবর। আগের
রাতেও বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছিলেন, সবাই মিলে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবেন। কিন্তু সেই যাত্রাই যে তার শেষ
যাত্রা হবে, তা কে জানত! পরদিন সকালে পরিবারের কাছে পৌঁছায় তার মৃত্যুর খবর।
মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া অংশে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে জুয়েলসহ শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পাঁচ ব্যবসায়ী নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
জুয়েলের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর বলেন, ‘সোমবার রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে যাবি? সে বলেছিল, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। এরপর সকালে ফোন পাই, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই।’
প্রায় দুই যুগ ধরে জাজিরার কাজিরহাট এলাকায় ব্যবসা করতেন জুয়েল। ভুসামালের পাশাপাশি রড-সিমেন্টের ব্যবসাও ছিল তার। সংসারের স্বপ্ন ছিল দুই সন্তানকে ঘিরে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তছনছ করে দিল তার সাজানো সংসার।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় এক বছর আগে জুয়েলের বাবাও মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার হারাতে হলো পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে। বাবার মৃত্যুর বাস্তবতা বোঝার বয়স হয়নি রিদিতা-সাইফানের। তাই তারা এখনও মায়ের কাছে জানতে চায়, বাবা কোথায়, কখন আসবেন?
কিন্তু যে বাবা জীবিকার তাগিদে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, তিনি আর ফিরবেন না। দরজায় বাবার ফেরার অপেক্ষা থাকবে, থাকবে অবুঝ দুই শিশুর প্রশ্ন— শুধু সেই প্রশ্নের উত্তরের মানুষটি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
জুয়েল ছাড়াও জাজিরা উপজেলার নিহত অন্য চারজন হলেন— ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে সালাল মোল্যা, কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার, ভুসামাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে হলুদ ব্যবসায়ী শাহিন বেপারী। মঙ্গলবার ভোরে দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত পাঁচজনই দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজিরহাটসহ আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করে আসছিলেন। ব্যবসায়িক কেনাকাটার জন্য তাহেরপুর যাচ্ছিলেন। সেখানে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া ও এ ধরনের অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনার উদ্দেশ্য ছিল তাদের। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারা।
জাজিরা থানার ওসি মো. সালেহ আহম্মেদ বলেন, সামাজিক মাধ্যমে দুর্ঘটনার বিষয়টি জেনেছি। তবে এখনো নাটোরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। মরদেহ জাজিরায় নিয়ে আসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
