পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুর রহমান
বয়স মাত্র ২৫ বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে অলৌকিক ক্ষমতার আশ্বাস দিয়ে তান্ত্রিক পরিচয়ে হাজির হতেন মিজানুর রহমান নামের এক তরুণ। পারিবারিক সমস্যা সমাধান কিংবা প্রেমের সম্পর্ক ঠিক করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন দিতেন তিনি। এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করে পাততেন প্রতারণার ফাঁদ। আর সেই ফাঁদে পা দেন এক নারী। পারিবারিক সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ধাপে ধাপে ওই নারীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন সাড়ে ছয় লাখ টাকা। কিন্তু সমস্যার সমাধান না হওয়ায় টাকা ফেরত চান ভুক্তভোগী। এতে উল্টো তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। অবশেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) জালে ধরা পড়েছেন ওই তরুণ।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর কল্যাণপুরে পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুর রহমান।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে নিজেকে তান্ত্রিক ও কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের খাদেম পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতেন মিজান। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৬ অক্টোবর জামালপুর সদর উপজেলার চর যথার্থপুর ভাটিপাড়া গ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এ সময় তাঁর কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। এরই মধ্যে মিজান আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সংস্থাটি জানায়, টিকটকে ‘তান্ত্রিক গুরু জীবন কবিরাজ’ নামের একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তান্ত্রিক পরিচয় দেওয়া মিজানুর রহমানের সঙ্গে এক নারীর পরিচয় হয়। নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইমো ও একটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন ওই নারী। একপর্যায়ে পারিবারিক সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কবিরাজির উপকরণ কেনার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়। গত ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিকাশের মাধ্যমে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠান ওই নারী। পরে প্রতারণার মাধ্যমে এসব টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় গত ৪ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী। ১০ অক্টোবর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) বিভাগকে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নাজমুল হক।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, বিভিন্ন টিকটক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নিজেকে কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত পাগলা মসজিদের খাদেম হিসেবে পরিচয় দিতেন মিজানুর রহমান। প্রাচীনকালের কবিরাজি উপাদান হিসেবে হাড়, মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করতেন তিনি। এসব ভিডিও নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করতেন। ভুক্তভোগী নারীও টিকটকে তাঁর ভিডিও দেখে পারিবারিক সমস্যা সমাধানের আশায় যোগাযোগ করেন। পরে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কবিরাজির উপকরণ কেনার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যার সমাধান না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে তাঁকে বিভিন্ন অলৌকিক শক্তির ভয় দেখানো হয়।
পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুর রহমান বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতারণা করে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কথিত তান্ত্রিক, কবিরাজ কিংবা অলৌকিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দেন। মামলার সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
