যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ দেশটিতে পাড়ি জমান। কারো যাত্রা শুরু হয় শিক্ষার্থী হিসেবে, কারো কর্মসংস্থানের মাধ্যমে, আবার কেউ পারিবারিক অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন। কিন্তু যে পথেই যাত্রা শুরু হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, বৈধ অভিবাসন-অবস্থা এবং যুক্তরাজ্যের পরিবর্তনশীল অভিবাসন আইন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। আমার পর্যবেক্ষণে, প্রবাসজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু একটি চাকরি পাওয়া নয়; বরং সেই চাকরি, নিজের দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা ও অভিবাসন-পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। বিশেষ করে লন্ডনের রেস্টুরেন্ট ও আতিথেয়তা খাতে কাজের মাধ্যমে অনেকেই কর্মজীবন শুরু করেন। তবে এই খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী বসবাসের অধিকার তৈরি হয় না। স্থায়ী হওয়ার পথ নির্ভর করে ব্যক্তির ভিসার ধরন, যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি শর্তের ওপর। অনেকের কাছে যুক্তরাজ্যে আসার প্রথম সুযোগ হলোÑ স্টুডেন্ট ভিসা। এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, কনফার্মেশন অব অ্যাকসেপ্টেন্স ফর স্টাডিজ, প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্যরে প্রমাণ এবং প্রযোজ্য ইংরেজি ভাষার শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি ভিসার শর্তের ওপর নির্ভরশীল। অনেক যোগ্য ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থী টার্ম চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন, যদিও সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরিÑস্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করলেই স্থায়ী বসবাসের পাঁচ বছরের যোগ্যতা তৈরি হয় না। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে স্টুডেন্টসহ বিভিন্ন বৈধ অভিবাসন রুটে কাটানো সময় ১০ বছরের লং রেসিডেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে বিবেচিত হতে পারে। তাই যুক্তরাজ্যে আসার শুরু থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। পড়াশোনা শেষ করার পর যোগ্য শিক্ষার্থীদের জন্য গ্র্যাজুয়েট ভিসা একটি সম্ভাব্য পথ। ১ জানুয়ারি ২০২৭-এর আগে আবেদন করা যোগ্য স্নাতকদের ক্ষেত্রে সাধারণত দুই বছরের অনুমতি প্রযোজ্য; ওই তারিখে বা তার পরে আবেদনকারীদের জন্য মেয়াদ হবে ১৮ মাস। পিএইচডি বা অন্যান্য ডক্টরাল যোগ্যতার ক্ষেত্রে মেয়াদ তিন বছর। এই ভিসায় সাধারণত নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ ছাড়াই কাজ করা যায়। ফলে এই সময়কে শুধু উপার্জনের সুযোগ হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের কর্মজীবন পরিকল্পনার সময় হিসেবেও ব্যবহার করা প্রয়োজন।
লন্ডনের রেস্টুরেন্ট খাত অনেক অভিবাসীর কর্মজীবনের একটি পরিচিত ক্ষেত্র। এখানে রান্নাঘর, খাদ্য প্রস্তুতি, গ্রাহকসেবা, ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য দায়িত্বে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, নিয়মিত পরিশ্রম করা, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো এবং আর্থিক দায়িত্ব সামলানোÑএসবই প্রবাসজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চাকরি পাওয়া এবং সেই চাকরির ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা পাওয়া দুটি আলাদা বিষয়। রেস্টুরেন্টে কাজ করলেই যে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তৈরি হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলোÑ স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা। সাধারণভাবে, এই রুটে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যোগ্য আবেদনকারীরা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন আইএলআর বা অনির্দিষ্টকালের জন্য বসবাসের অনুমতির আবেদন করতে পারেন। তবে পাঁচ বছর পূর্ণ হলেই অনুমতি নিশ্চিত হয় না। আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট চাকরি, বেতন, স্পনসরশিপ, বসবাসের ধারাবাহিকতা এবং আবেদনের সময় কার্যকর অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। তাই চাকরি বাছাইয়ের সময় শুধু বেতন বা কর্মপরিবেশ নয়, সংশ্লিষ্ট পদের অভিবাসনগত যোগ্যতাও যাচাই করা জরুরি।
যারা বিভিন্ন বৈধ অভিবাসন রুটে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ১০ বছরের লং রেসিডেন্স রুট প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এই ব্যবস্থায় সাধারণত ১০ বছরের ধারাবাহিক বৈধ বসবাসের শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে সব ভিসার সময় গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয় না এবং যুক্তরাজ্যের বাইরে অবস্থানের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনকারীর ভিসার ইতিহাস, অনুমতির ধারাবাহিকতা ও অনুপস্থিতির হিসাব যাচাই না করে এই রুটে যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
আমার পরামর্শ হলো, যুক্তরাজ্যে আসার পর থেকেই নিজের ভিসার মেয়াদ, আবেদনসংক্রান্ত নথি, ভ্রমণের রেকর্ড এবং চাকরির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। পাশাপাশি অভিবাসন আইন ও নীতিমালার পরিবর্তন সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখা প্রয়োজন। কারণ আজ যে নিয়ম কার্যকর রয়েছে, ভবিষ্যতে তা পরিবর্তিত হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থায়ী বসবাসের অনুমতি অর্জন এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়া এক বিষয় নয়। সাধারণ নিয়মে, ওখজ পাওয়ার পর আরও ১২ মাস অপেক্ষা করে নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়, যদি বসবাসের মেয়াদ, অনুপস্থিতি, ইংরেজি ভাষা, লাইফ ইন দ্য ইউকে পরীক্ষা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়। ব্রিটিশ নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম ভিন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি একটি বড় অর্জন হলেও নাগরিকত্বের জন্য আলাদা যোগ্যতা ও আবেদনপ্রক্রিয়া রয়েছে।
আশরাফুল ইসলাম হাসিব হিসেবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা কখনোই অনুমান বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা উচিত নয়। নিজের ভিসার শর্ত বুঝে চলা, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো, চাকরির ভিসাগত যোগ্যতা যাচাই করা এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী পদক্ষেপ পরিকল্পনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে নিবন্ধিত অভিবাসন পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া উচিত।
যুক্তরাজ্যে জীবন গড়ার পথ সবার জন্য এক নয়। কারো জন্য শিক্ষা, কারো জন্য কর্মসংস্থান, আবার কারো জন্য দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাস হতে পারে স্থায়ী হওয়ার উপযুক্ত পথ। অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া যায়, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজের পরিস্থিতি ও আইনি যোগ্যতার ভিত্তিতে। আমার কাছে প্রবাসজীবনের সাফল্য মানে শুধু ভালো চাকরি বা আর্থিক স্বচ্ছলতা নয়; বরং বৈধ অবস্থান বজায় রেখে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। সঠিক তথ্য, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তই পারে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি জীবন গড়ার পথকে আরও সুসংগঠিত করতে।
লেখক : লন্ডন প্রবাসী
