পহেলা ভাদ্র হোক কিংবা পহেলা বৈশাখ, বাঙালির জীবনে উৎসবের কোনো কমতি নেই। বারো মাসে তেরো পার্বণ তো আছেই, তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে আরও কিছু আধুনিক দিবস। কোনোটার সঙ্গে ফুল, কোনোটার সঙ্গে ফল, কোনোটার সঙ্গে ভালোবাসার, কোনো কোনো দিবসের সঙ্গে থাকে জীবনের বাস্তবতা।
সেদিন সকালে গাড়িতে বসে ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল, আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস। ভাবলাম, বাহ! বাঁশও দেখি দিবস পেয়ে গেছে! কমেন্টে গিয়ে দেখি একজন লিখেছেন, বাঁশ আমাদের সংস্কৃতি, বাঁশ আমাদের ঐতিহ্য। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতি সর্বত্রই আজ বাঁশের জয়জয়কার।
লেখাটা পড়ে মুচকি হাসছিলাম। আমার পাশেই বসেছিলেন আমাদের মহামান্য বড় ভাই টিটু। ও হ্যাঁ, টিটু ভাইয়ের পরিচয়টা দেওয়া দরকার।
গত নির্বাচনে নমিনেশন না পাওয়ার পর থেকে ভাইয়ের মধ্যে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। আগে রাজনীতি করতেন, এখন দর্শন করেন। আগে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, এখন মানুষকে জ্ঞান দেন। জীবনের এমন কোনো বিষয় নেই, যেটা নিয়ে তার দুই-চারটা গভীর কথা নেই।
— ভালোবাসা?
— ভালোবাসা আসলে একটা মায়া।
— বন্ধুত্ব?
— বন্ধুত্ব স্বার্থের আরেক নাম।
— রাজনীতি?
— রাজনীতি হলো ধৈর্যের পরীক্ষা।
— আর নির্বাচন?
এই প্রশ্ন করলে ভাই একটু চুপ করে যান। আমি অবশ্য প্রশ্ন করি না। হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হাসছো কেন?
আমি বললাম, আজকে নাকি বাঁশ দিবস!
ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, বাঁশ দিবস?
— জি।
— আমি বুঝি না, এসব বাঁশ-টাশ দিবস কেন পালন করে মানুষ! এসব দিবস পালনের মানেটা কী?
তারপর একটু গলা খাঁকারি দিয়ে যোগ করলেন, মানুষ এখন দিবস নিয়ে পড়ে আছে। অথচ জীবনের আসল সমস্যাগুলো নিয়ে কেউ ভাবে না। একটা জাতি কতটা অধঃপতিত হলে বাঁশেরও দিবস পালন করতে হয়, বুঝো!
আমি চুপ করে রইলাম। কারণ টিটু ভাই যখন জ্ঞান দেওয়া শুরু করেন, তখন মাঝখানে কথা বলা মানে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনা।
তিনি বলে চললেন, বাঁশ একটা প্রতীক। বুঝলে? এটা আমাদের সমাজের...
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে জেলা কমিটির বড় ভাইয়ের নাম। টিটু ভাইয়ের মুখের দর্শন মুহূর্তেই বাস্তবতায় ফিরে এল। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা, টিটু, আজকে মানববন্ধন মনে আছে তো?
টিটু ভাই একটু আমতা আমতা করে বললেন, জি ভাই, মনে আছে। আসলে ভাই, পেটে একটু ইনফেকশন হয়েছে...
ওপাশ থেকে জবাব এল, ইনফেকশন-টিনফেকশন ওসব ঠিক হয়ে যাবে। শুনেন, কমিটি থেকে আপনাকে একটা বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
টিটু ভাই এবার সোজা হয়ে বসলেন, জি ভাই, বলেন।
— আজকের ব্যানারটা কিন্তু আপনার নিজের পকেটের টাকায় প্রিন্ট করতে হবে। বুঝছেন তো?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর টিটু ভাই খুব নিচু গলায় বললেন, জি ভাই।
কলটা টুট টুট শব্দে কেটে গেল। টিটু ভাই কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো, জীবনে এই প্রথম তার দর্শনের সঙ্গে বাস্তবতার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে।
আমি বললাম, ভাই, কী হলো?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ব্যানার প্রিন্ট করতে হবে।
— তো?
কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন। মানিব্যাগ খুলে আমার সামনে ধরলেন। ভেতরে একখানা ৫০ টাকার নোট। সেটাও আবার স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো।
আমি আর কিছু বললাম না। কারণ কিছু কিছু মুহূর্তে কথা বলা অপ্রয়োজনীয়। পরিস্থিতিই যথেষ্ট কথা বলে।
টিটু ভাই ৫০ টাকার নোটটার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি আর মনে মনে ভাবছি। ভাই নিশ্চয়ই এবার বুঝতে পারছেন, বাঁশ দিবসের মাহাত্ম্য আসলে কী।
