নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলো ৮ বছরের শিশু ও তার বাবাসহ ১৪ জনের। ঘটনার কারণ উদঘাটনে ইতোমধ্যেই গঠন করা হয়েছে ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি। তবে আহত যাত্রী ও নিহতের স্বজনদের তথ্যর সঙ্গে বিআরটিএর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য।
দুর্ঘটনায় আহত মাদারীপুর জেলার মোস্তাকপুর এলাকার অধিবাসী আব্দুস সালাম(৩০)। দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তিনি দুর্ঘটনার বিষয় বলতে গিয়ে জানালেন, গাড়িটির সব সিটেই যাত্রী ছিল। শুধু তাই নয়, গাড়ির ভেতর যাত্রীদের হাঁটা চলার জায়গাও ছিল যাত্রীতে ঠাসা।
গাড়ির চালকের বিষয়ে তিনি জানান, মাঝে মাঝেই গাড়ির গতি বাড়ছিল। আবার কমছিল। চালক মাঝে মাঝেই এমন ব্রেক কষছিল যে, তার মতো অন্য, যাত্রীরাও সিট থেকে ছিটকে পড়ার উপক্রম হচ্ছিলেন। চালককে বারবার নিষেধ করেও কোনো ফল হয়নি।
তার দাবি, কুষ্টিয়ায় হোটেলে খাবার খেয়ে সিটে ঘুমিয়ে যান। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙতেই দুর্ঘটনায় যাত্রীদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পান। প্রাণে বাঁচতে সিটের পাশের জানালার কাঁচ ভেঙে গাড়ি থেকে লাফ দেন তিনি।
রাজশাহীর এক অধিবাসী জানান, তার মামা সপরিবারে শরিয়তপুর থেকে তাদের বাড়ি বেড়াতে আসছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় মামা ও মামাতো বোনের মৃত্যু হয়েছে। মামি হাসপাতালে।
শরিয়তপুরের কয়েকজন কাঁচামাল ব্যবসায়ী জানান, তাদের ব্যবসায়ী পার্টনার পুঠিয়ায় আসছিলেন। রাত ১২টার সময়ও মোবাইলে কথা হয়েছে। রাত ৩টার দিকে পৌঁছার কথা থাকলেও না পৌঁছায়, সকালে ফোন দিলে তা বন্ধ পান। পরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসেন নাটোর হাসপাতালে। পৌঁছে দেখেন পার্টনার জীবিত নাই।
নাটোর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কয়েক মিনিটেই পৌঁছেন স্পটে। গাড়ি থেকেই দেখতে পান রাস্তার এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মানুষ। সহকর্মীদের নিয়ে পরীক্ষা করে একে একে ৯ জনের মৃতদেহ পান। কান্না আর চিৎকারের ভয়াবহতার মাঝেই ত্বরিত গতিতে আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত-নিহতদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মহাসড়ক আর রাস্তার পাশের ঘাস। তিনিসহ সহকর্মীদের শরীরেও লেগেছে রক্তের দাগ।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন জানান, দূর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুইটির সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে গেছে।
স্থানীয় অধিবাসী রেজাউল করিম জানান, বিকট শব্দে তারা ছুটে গিয়ে দেখেন ভয়াবহ দৃশ্য। উভয় চালক নিজ আসনেই মরে আছেন। কেউ রাস্তায় রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাঁচার আকুতি আর কান্না করছেন। কেউ বা সিটে চাপা পড়ে আছেন। ফায়ার সার্ভিস এবং তার মতো শত শত মানুষের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করা হয়েছে।
নাটোর বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক উত্তম কুমার দেবশর্মা জানান, দূর্ঘটনাকবলিত বাসটি পটুয়াখালির কুয়াকাটা থেকে চাপাইনবাবগঞ্জে যাচ্ছিল। আর বালুবোঝাই ট্রাকটি যাচ্ছিল কুড়িগ্রাম থেকে পাবনায়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ওই বাসটির রুট পারমিট ২০২৮ সালের ১৩ মে অবধি থাকলেও ফিটনেস শেষ হয় গত ১৩ মে।
নাটোর মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহানারা বিউটি জানান, ফিটনেসবিহীন গাড়ির আনফিট চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় ঝড়ল ১৪ প্রাণ। অন্যদের সঙ্গে ওই চালকের স্বজনদেরও নিশ্চয়ই কান্নার রোল চলছে। তবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি এতদিন কীভাবে চলল? আর এমন বেপরোয়া গাড়িচালক, পুলিশ ট্রাফিকের কোনো বাধা ছাড়াই কীভাবে গাড়ি চালালেন তা নিয়ে প্রশ্ন করেন তিনি।
পুলিশ সুপার (এসপি) শরীফুল হক এবং জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার জানান, তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কামাল/নাঈম
