বেসরকারি গবেষণা ও জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বারসিকের সহযোগিতায় গ্রিন কোয়ালিশন, সংগঠিত জনসংগঠন, শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী অ্যাসোসিয়েশন, সুন্দরবন ইয়ুথ সলিডারিটি টিম, সিরিও ও শরুব যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
আবেদন পাঠ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গ্রিন কোয়ালিশন শ্যামনগর পৌরসভার সভাপতি ও সাবেক শিক্ষক কৃষ্ণানন্দ মুখার্জি। ‘বিষমুক্ত সুন্দরবন, নবীন-প্রবীণের আবেদন’ যৌথভাবে পাঠ করেন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিমা আক্তার, মিস ঈশিতা ও মেহজাবিন সুলতানা।
আবেদনে শিক্ষার্থীরা বলেন, সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে এ বনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের নদী ও খালগুলো মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু এসব জলাশয়ে কীটনাশক ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় ৬৮ খালে বিষ প্রয়োগের তথ্য, আবেদনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিভাগের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের ৪১, ৪২, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ ও ৫৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষণার বরাত দিয়ে আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের মোট ১৪৭টি খালের মধ্যে ৩১টিতে সর্বাধিক, চারটিতে মাঝারি এবং ৩৩টিতে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ৬৮টি খালে বিভিন্ন মাত্রায় বিষ প্রয়োগের তথ্য উঠে এসেছে।
আয়োজকদের মতে, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ফলে শুধু লক্ষ্যবস্তু মাছই নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সুন্দরবনের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল এবং বননির্ভর মানুষের জীবিকার ওপর পড়তে পারে।
সাত দফা দাবি উত্থাপন, সুন্দরবনের জলজ পরিবেশ রক্ষা ও বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধে কর্মসূচি থেকে সাত দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ খালগুলোতে বন বিভাগ, কমিউনিটি প্যাট্রলিং গ্রুপ (সিপিজি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত টহল এবং আকস্মিক অভিযান পরিচালনা।
বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। বিষাক্ত রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবহার ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ। বিষ প্রয়োগে ধরা মাছের সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ প্রতিরোধ। ঝুঁকিপূর্ণ খালের পানি ও জলজ প্রাণীর ওপর বিষের প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিষ প্রয়োগের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সমন্বিত সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার।
এ ছাড়া বননির্ভর জনগোষ্ঠী, জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, যুবসমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি অভিযান, শনাক্ত অপরাধ এবং গৃহীত ব্যবস্থার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশের দাবিও জানানো হয়েছে।
কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ, অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা গ্রিন কোয়ালিশনের উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম. বেলাল হোসেন, বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মো. এরফান উদ্দীন, সাতক্ষীরা সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহমুদা খাতুন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি মো. মুহসিন বিল্লাহ, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি ডা. যোগেশ মণ্ডল এবং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন গ্রিন কোয়ালিশনের গোবিন্দ মণ্ডল।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের সভানেত্রী শেফালী বিবি, বড়কুপট সবুজপাতা নারী সংগঠনের সভানেত্রী পারুল রানী বৈদ্য, বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আইয়ুব আলী, বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শাহীন ইসলাম ও সহযোগী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রামকৃষ্ণ জোয়ারদারসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
কর্মসূচি থেকে আয়োজকেরা সুন্দরবনের নদী-খালকে বিষমুক্ত রাখা, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন। তাঁদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগ ও নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমেই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ বনকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
The post সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধের দাবি, ৬৮ খালে বিষ প্রয়োগের তথ্য appeared first on ভোরের চেতনা.
