সরকারি মাধ্যমিকে শিক্ষকসংকট শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যবস্থা নিন
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে চরম শিক্ষকসংকট বিরাজ করছে। প্রায় ৩৮ শতাংশ সহকারী শিক্ষক এবং ৬৬ শতাংশের বেশি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে। পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি শিখনব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষক নিয়োগ দিতে এক দশকেরও বেশি সময় লাগছে। প্রতিবছর ৩০০ শিক্ষক অবসরে যাওয়ায় পদ পূরণের বদলে উল্টো ঘাটতি থেকে যাচ্ছে; যা শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রতিবছরের শিক্ষকসংকটের চিত্র ও পরিসংখ্যান মাওশি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইলবন্দি থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখে না। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বিধিমালা নিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ৩১৩টি পুরোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ হাজার ৭৫৬টি সহকারী শিক্ষক পদ তৈরির জন্য ২০২৩ সালে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই পদগুলো সৃজনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি মাধ্যমিকের জন্য ২০১৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সুষ্ঠু পদ বিভাজন করে দিলেও আজ অবধি তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, পদ তৈরির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষিত রাখতে হয়। প্রেষণ, পদায়ন, পিএইচডিজনিত বা বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব পদ সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের সময় এই ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করা হয় না। এর ফলে উচ্চতর ডিগ্রি, প্রশিক্ষণ গ্রহণেরও সুযোগ মেলে না। অনেকে স্নাতকোত্তরও করতে পারেন না। শিক্ষকদের অভিযোগ, উল্টো শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ ও পিএইচডির জন্য শিক্ষকদের নিরুৎসাহিত করছে।
শিক্ষকরা বলছেন, সংকট নিরসনে পাবলিক সার্ভিস কমিশন শুধু শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে। তারা মনে করে, এ ক্ষেত্রে সদিচ্ছার চরম অভাব রয়েছে। এ কারণে সরকারি মাধ্যমিকের নিয়োগ কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে আছে। নন-ক্যাডার নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। এতে মান ও ঐতিহ্য সব হারাতে বসেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর সঙ্গে কাজের চাপে শিক্ষকরাও মানসিক উদ্যম হারাচ্ছেন। এতে ব্যাহত হচ্ছে উচ্চতর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, একটি পেশাদার সিভিল সার্ভিসের আদলে ‘ন্যাশনাল টিচিং সার্ভিস কোর’ গঠন করে মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন-ভাতা দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া দরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এমন সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার সেই সুপারিশগুলো আমলে নেয়নি। বিচ্ছিন্ন ও আংশিক কিছু উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বর্তমান সরকার। এভাবে শিক্ষকসংকট নিয়ে শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
শিক্ষকসংকট দূর করতে অবিলম্বে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, যাতে পাঠকার্য স্বাভাবিক রাখা যায়। সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। অবিলম্বে শিক্ষাসংক্রান্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। যারা অবসরে যাচ্ছেন তাদের বিপরীতে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সে পদগুলো পূরণ করা জরুরি। আশা করছি, সরকার অচিরেই মাধ্যমিক শিক্ষকসংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
আরও পড়ুন
শুভ শারদীয় দুর্গোৎসব প্রাণে প্রাণে পৌঁছে যাক মিলনের বারতা
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১১ পিএম
সমগ্র জীবের কল্যাণসাধনই সব ধর্মের মূল বাণী। কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণসাধন নয়–এই চেতনা ধারণ করেই জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের এবং সব জীবের মঙ্গল কামনায় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় উদ্যাপন করে শারদীয় দুর্গোৎসব, আরাধনা করে দেবী দুর্গার।
বাংলায় প্রথম শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয় ইংরেজি ১৪৮০ সালে, এই বাংলাদেশেই। রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ আশ্বিন মাসের মহাষষ্ঠী তিথিতে এই পূজার সূচনা করেন। শাস্ত্রীয় নিয়মে দুর্গাপূজার মূল সময় হলো বসন্তকাল, যা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে লঙ্কা জয়ের আগের অকালবোধনের কাহিনি অনুসরণ করে রাজা কংস নারায়ণ এই শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনা করেন। ভিন্নমত থাকলেও মোটাদাগে শারদীয় পূজার এই মতটাই স্বীকৃত।
শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আনন্দময় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। আশ্বিন বা কার্তিক মাসের শরৎকালীন নীল আকাশ, শিউলি ফুলের গন্ধ আর কাশবনের দোলা জানান দেয় দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন বার্তা। শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলেই একে বলে ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’। মূলত মহালয়ার পুণ্যতিথি থেকে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে এবং ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে মূল উৎসব।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, স্বর্গের দেবতাদের অত্যাচারী অসুররাজ মহিষাসুরের হাত থেকে রক্ষা করতে মহাশক্তি দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়েছিল। দেবী দুর্গা ১০ হাতে ১০টি অস্ত্র নিয়ে মহিষাসুরকে বধ করেন এবং স্বর্গে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। তাই তিনি ‘মহিষাসুরমর্দিণী’। বসন্তকালে রাজা সুরথ প্রথম এই পূজার প্রচলন করেছিলেন, যা ‘বাসন্তী পূজা’ নামে পরিচিত। তবে রামায়ণের কাহিনি অনুসারে, লঙ্কার রাজা রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে অকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। রামচন্দ্রের এই অসময়ের পূজাকে শাস্ত্রে ‘অকালবোধন’ বলা হয়। বর্তমান যুগে এই শারদীয় উৎসবই বাঙালির প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে।
শাস্ত্রমতে, সব বিপদ থেকে যিনি জীবকে রক্ষা করেন, জগতের কল্যাণ সাধন করেন ও মানুষের দুঃখকষ্ট দূর করেন, তিনিই হচ্ছেন দেবী দুর্গা। শারদীয়ার আবহগুলো দেখলে বা এর অনুষঙ্গের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এর পরতে পরতে আবহমান বাংলা এবং বাঙালির রূপ। বাংলার বাইরে হিন্দু-অধ্যুষিত অন্য কোনো দেশে বা এলাকায় দুর্গা এভাবে বন্দিত হন না। বাংলায় দুর্গার ধারণাই ভিন্ন। এখানে তিনি অসুররূপী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নারী শক্তির প্রতীক। তার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয় নারীর জাগরণ। তিনি দুর্গা দশভুজা। যেমন দশভুজা ঘরে ঘরে বাংলার মায়েরা। তারা অদৃশ্য ‘দশ হাতে’ সংসার সামলান। দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার বা উপাসনার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনোৎসব। ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে সব স্তরের মানুষ এই উৎসবে শামিল হয়।
উৎসবমুখরতার মধ্য দিয়ে সব ধরনের হীনতা, সংকীর্ণতা ও ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন করে এবং আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহণ করে। সবাই মিলিত হয় অভিন্ন মোহনায়, অভিন্ন চেতনায়। পূজার ধর্মীয় অংশটুকু হিন্দুদের; কিন্তু মেলা, উৎসব ও আপ্যায়নে অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে শারদীয় দুর্গাপূজা পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে, পরিণত হয় সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায়, পরিণত হয় অন্যতম জাতীয় উৎসবে। ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে এ উৎসব পরিণত হয় সম্প্রীতিময় আনন্দযজ্ঞে। পূজা থেকে উৎসবে রূপান্তরের এই যে প্রক্রিয়া, এটি বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক সত্তার চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, ঈদে মিলাদুন্নবী, জন্মাষ্টমী, শারদীয় দুর্গোৎসব, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠান কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উদ্যাপিত হয়। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীনির্বিশেষে সব মানুষের মঙ্গল কামনাই এই উৎসবের মূল প্রেরণা।
আরও পড়ুন
প্রবাসীদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিন সৌদিতে ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৯ পিএম
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটি। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশের পর জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট বিষয়টি জানতে পারে। আগে থেকে বাংলাদেশকে না জানিয়ে বিচার-প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রবাসে অবস্থানকারী প্রত্যেক নাগরিককে সে দেশের আইন মানতে হবে, এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনই বিদেশে কোনো নাগরিক অভিযুক্ত হলে সেখানেও কিছু বিধিবদ্ধ নিয়ম রয়েছে। কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে স্পষ্ট বলা আছে। সৌদি আরব ও বাংলাদেশ ভিয়েনা কনভেনশন স্বাক্ষরকারী দেশ। এখানে বিদেশি নাগরিক আটক হলে এ-সংক্রান্ত বিধান মানার বাধ্যবাধকতা দুই দেশেরই রয়েছে। আমরা মনে করি, পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে তারা এর আগেও এ ধরনের কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, পুরো প্রক্রিয়া কয়েক মাস ধরে চলেছে। সর্বশেষ রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ এ সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কিছুই জানল না, এটা যেমন অবাক করার বিষয়, তেমনি উদ্বেগের। দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। দণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে কেন জানানো হলো না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবে লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিক অবস্থান করছেন। শ্রমিকদের নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এ অবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং চরম হতাশার। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে গেছেন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ নারী কর্মী। একই সময়ে দেশে এসেছে ৪১২ নারীর মরদেহ। এর মধ্যে ৮৪ অভিবাসী নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার ৭৬ শতাংশ ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় অংশের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মূনীর খবরের কাগজকে বলেন, বিদেশে প্রবাসীদের সেবা দিতে দূতাবাসের কোনো গাফিলতি আছে কি না, সে বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। সৌদিতে দুই বাংলাদেশির বিচার নিশ্চয়ই এক দিনে হয়নি। পাশাপাশি সৌদি সরকার বিষয়টি কেন জানায়নি, সেটাও জানতে চাওয়া দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানোটাই ভুল সিদ্ধান্ত। অন্য কোনো দেশ এখন আর সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠায় না। এই সেক্টরটিই নারীদের জন্য একটি নির্যাতনের ফাঁদ, এ বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিকরা নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরলেও আইনি জটিলতা এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির দুর্বলতার কারণে অপরাধী সৌদি কফিলদের জবাবদিহি বা শাস্তির মুখোমুখি করার নজির প্রায় নেই বললেই চলে। প্রবাসে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অনেক নারী কর্মী লোকলজ্জা বা সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আইনি অভিযোগ করতে চান না। শুধু ব্যক্তিগত নির্যাতনের ঘটনায় নয়, বিদেশে নারী গৃহকর্মীদের কর্মপরিবেশ ও অধিকার সুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে চলে এসেছে। সৌদি আরবে আটক বা বিচারাধীন যেসব বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, তাদের জন্য একটা সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাসহ সৌদিসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের ধারাবাহিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। তাই প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সৌদিতে ন্যায়বিচার নিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা হওয়া জরুরি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ দূতাবাসকে এ ব্যাপারে আরও সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। দূতাবাসকে না জানিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা। এর দায় দূতাবাস এড়াতে পারে না।
আরও পড়ুন
চরম সংকটে বাড়ছে দারিদ্র্য পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নিন
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় দারিদ্র্য মোকাবিলা করা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক সংকট এ ধরনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচনের দিকে সরকারের নজর থাকলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না; বরং দারিদ্র্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুদ্ধ-সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট পরিমাণে না হওয়ায় কর্মসংস্থান কমেছে এবং সেই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অর্থনীতির ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য পরিস্থিতির ওপর। মৌলিক অধিকারের বহুমুখী অভাবে মানুষ আজ দিশেহারা। আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর শঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্তরাও। এ ছাড়া অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা গোষ্ঠী হয়ে যাচ্ছে দরিদ্র। জনসংখ্যার বড় একটা অংশ নিম্নবিত্ত থেকে নেমে যাচ্ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে। এদের সংখ্যা ৬ কোটিরও বেশি; যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে ক্রমেই দারিদ্র্যের চক্রে এগোচ্ছে দেশ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ চিত্র নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন ৫ কোটি ১৩ লাখ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে চরম দারিদ্র্য বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দৈনিক তিন ডলারের কম ব্যয় করলে দারিদ্র্যসীমার আওতায় পড়েন।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক- এমপিআই অনুযায়ী বাসস্থান, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা– এই মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবেই তৈরি হয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। আর এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা।
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি- তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে আশির দশকের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির মধ্যে সর্বনিম্ন। পাকিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের মতো এমন অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশই নেই। এতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে দারিদ্র্যের হার আবার বাড়ছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রফেসরিয়াল ফেলো ও অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য কমানোর জন্য যেসব কার্যক্রম প্রয়োজন, সেগুলোতে একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এর ওপর যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
দেশে দারিদ্র্য বাড়ার প্রবণতা খুবই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে গত চার বছরে এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে চরম বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এ বৈষম্যের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই সরকারকে এ সংকট অবস্থা থেকে উত্তরণে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি আইএমএফের প্রতিবেদন বলছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার। তাই বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য কমিয়ে আনা জরুরি। কী কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে, সেসব বিষয় পর্যালোচনা করে সরকার একটি সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন
মহাসড়কে ডাকাতের দৌরাত্ম্য যাত্রীনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের দৌরাত্ম্যে মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা আতঙ্কের মুখে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও উত্তরাঞ্চলকে সংযুক্ত করা বিভিন্ন মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়কে প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। যাত্রী, চালক ও পণ্যবাহী যানবাহনের কর্মীদের জন্য দীর্ঘ পথের যাত্রা ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় ডাকাতদের এমন তৎপরতা রোধের দায় কার? ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত থাকার পরও অপরাধীরা কীভাবে বারবার হামলার সুযোগ পাচ্ছে?
পুলিশ সদর দপ্তর পরিসংখ্যান পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১২৩টি। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৪৬৭টি। এসব তথ্য পুলিশের নথিভুক্ত অপরাধের হিসাব। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মামলা না হওয়ার কারণে অনেক ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে স্থান পায় না। অর্থাৎ নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যা দিয়েই সড়কে মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তাহীনতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৫টি স্থানকে ডাকাতিপ্রবণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত দুই ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটে। একদিকে নির্জন সড়ক বেছে নিয়ে ডাকাতি করা হয়; অন্যদিকে প্রবাসী বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। অপরাধের ধরন যখন পুলিশের জানা, তখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকার কারণ কী। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা গ্রহণ, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার কিংবা অভিযান চালানোর খবর প্রচার করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। জনগণ জানতে চান, এসব অভিযানে কতজন সংঘবদ্ধ ডাকাত গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও হাইওয়ে পুলিশকে সমন্বিতভাবে সড়ক নিরাপত্তার জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারলে চলমান অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় টহলের নির্দিষ্ট সময়সূচি, জনবল, নজরদারির ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা পাওয়ার কার্যকর পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ডাকাতির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, অপরাধী চক্র শনাক্ত এবং আন্তজেলা যোগাযোগব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত বিরতিতে অপরাধের পরিসংখ্যান, তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়নের অবস্থা প্রকাশ করা জরুরি। কোনো এলাকায় বারবার ডাকাতির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে হবে; দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে মুক্তি, দীর্ঘ বিচার-প্রক্রিয়া এবং যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার প্রবণতা পুনরায় অপরাধে জড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে জামিনকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, শক্তিশালী অভিযোগপত্র এবং সময়মতো বিচার। একই সঙ্গে তদন্তে গাফিলতি ও মামলার অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সড়কে ডাকাতি কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সমস্যা নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যাত্রী বা চালক ডাকাতের হামলার শিকার হলে তাদেরই কেন নিরাপত্তার ঝুঁকি বহন করতে হবে? ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত থাকার পরও অপরাধ ঘটলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। মানুষ শুধু গ্রেপ্তারের ঘোষণা শুনতে চান না; চান অপরাধ কমার প্রমাণ, দ্রুত বিচার এবং নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা। সড়ক ও মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার হিসাবও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
