আসিফ আরসালান
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসনে বিরোধীদল সমূহের প্রতি বিশেষ করে প্রধান দুটি বিরোধী দল জামায়াত ও বিএনপির বিরুদ্ধে সব সময়েই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উত্থাপিত হতো। এতো বেশি যত্রতত্র শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ উত্থাপন করতেন যে শিক্ষিত সচেতন মানুষ এক সময় শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বলে আখ্যায়িত করা শুরু করেন। ১৫ বছর ধরে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আওড়ালেও একটি ষড়যন্ত্রও তিনি উদ্ঘাটন ও প্রমাণ করতে পারেননি। ৫ অগাস্ট জুলাই বিপ্লবের পরেও ভারতের মাটিতে গিয়ে তিনি জুলাই বিপ্লবের পেছনে আরেকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। এখন আর জনগণ শেখ হাসিনার এসব উক্তিকে পাত্তা দেয় না। তারা শেখ হাসিনার ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে ফালতু মনে করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের জুলুম শাহীর পতনের পর নতুন যে সরকার এসেছে সেই বিএনপি সরকারও দেখছি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ৮ মাসের শাসনামলে অনেক মন্ত্রী এবং এমপি এবং বিএনপির মধ্যম পর্যায়ের নেতারা ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। আমরা এসব কথাকে আমলে নেইনি। কিন্তু এখন দেখছি সেই কথা বলা শুরু করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর কথাকে আমলে না নিয়ে তো কোনো উপায় নাই। এবার তিনি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন জনসভায় এবং সেটাও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে করেছেন।
গত ২০ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে রাত ১০টার দিকে যে খবর প্রকাশিত হয় তার শিরোনাম ছিলো, “রাজশাহীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী/ পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুই পক্ষ এক হয়েছে”। দেশের কয়েকটি জায়গায় ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। পলাতক স্বৈরাচার শ্রমিক অসন্তোষ তৈরিতে অর্থ সরবরাহ করছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন টিকিট বিক্রির চেষ্টা করা কয়েকটি দলও এতে যুক্ত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা বলেন।
শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখান থেকে অর্থাৎ ভারত থেকে অর্থ সরবরাহ করছে। কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতটা দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে। এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।’
জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘৭১ সালে তারা যেভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে, ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছি, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকেও তারা ধোঁকা দিয়েছে। তারা মুখে একটি কথা বলছে, তাদের কর্মে আরেকটির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
যদি একটি মাত্র পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে এই নিউজটি প্রকাশিত হতো তাহলেও প্রধানমন্ত্রী সেই কথা বলেছেন কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যেতো। কিন্তু একই খবর অন্তত আরো দুটি পত্রিকার প্রিন্ট সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। একটি হলো ২১ অক্টোবর বুধবারের প্রিন্ট সংস্করণে। যুগান্তরের ২১ অক্টোবর প্রিন্ট সংস্করণে প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলাম ব্যাপী শিরোনাম দেয়া হয়েছে, “রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী/পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে”। এখানে আর কোনো রাখ ঢাক নাই। পতিত স্বৈরাচারের সাথে তিনি বিরোধী দলকে এক ব্র্যাকেটে বন্দী করেছেন। বিরোধী দল বলতে তো এখন প্রধানত জামায়াতে ইসলামীকেই বোঝায়। জাতীয় সংসদে তাদের যেমন ৭০টিরও বেশি আসন রয়েছে তেমনি মাঠ পর্যায়েও ইউনিয়ন লেভেলেও তাদের সংগঠন রয়েছে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী যখন বিরোধী দল কথাটি উচ্চারণ করেন তখন তিনি অবশ্যই জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করেন।
যুগান্তরের এই সংবাদের এক স্থানে বলা হয়েছে, যারা একাত্তরে ধোকা দিয়েছিলো তারা ২৪ এর জুলাই আন্দোলনেও ধোকা দিয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে আমরা সব রাজনৈতিক দলকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। কিন্তু জুলাইয়ের শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেসব দলের কোনো প্রতিনিধি সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলো না। তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে তারা যেনো কি টিকেট বিক্রি করছিলো। সেই টিকেট জনগণ খায় না। সেসব ভ্রান্ত রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।
বক্তৃতাকালে তিনি আরো বলেন, সবশেষ মাত্র ২ বছর আগে ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে এদেশের মানুষ ছাত্র জনতা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। মা বোনেরা, শিশু কিশোর ও তরুণরা রাজপথে নেমে এসেছিলো। লাখ লাখ মানুষ দেশের প্রতিটি জেলায় আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলো। সেদিনও আমরা জিজ্ঞাসা করিনি, কে হিন্দু কে মুসলমান। গুলীবিদ্ধ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেউ পথে মারা গেছে। তখনও কেউ জিজ্ঞাসা করেনি, তার ধর্মীয় পরিচয় কি? সবার একটিই লক্ষ্য ছিলো, মানুষের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
একই ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজি ডেইলি স্টারের প্রিন্ট সংস্করণের প্রথম পৃষ্ঠায়। শিরোনাম, Ousted autocrat, opposition out to stir unrest/ says Tareq during his whirlwind tour, বাংলা অনুবাদ- “পতিত স্বৈরাচার এবং বিরোধী দল অসন্তোষ সৃষ্টিতে উস্কানি দিচ্ছে/ ঝটিকা সফরে তারেক রহমান।” তার বক্তৃতা ডেইলি স্টারে ইংরেজিতে যা প্রকাশিত হয় তার অংশ বিশেষের বাংলা নিম্নরূপ। “গতকাল প্রধামন্ত্রী জনগণকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। বলেছেন যে, পতিত স্বৈরাচার এবং বিরোধী দলের একটি অংশ দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য হাত মিলিয়েছে। আমাদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে যে, পতিত সরকার সীমান্তের ওপার থেকে একটি বিশেষ দলকে বিপুল টাকা পয়সা দিচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, ঐ দলটি যেনো দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে। এব্যাপারে জনগণকে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সজাগ থাকতে বলেন।
আমরা জনাব তারেক রহমানের বক্তৃতার অংশ বিশেষের এক বিন্দুও পরিবর্তন বা বিকৃত না করে হুবহু ছাপিয়ে দিলাম। পতিত দলটি বিদেশ থেকে বিপুল টাকা পয়সা ছড়াচ্ছে কিনা সেব্যাপারে আমাদের কোনো মন্তব্য নাই। সরকারের নানা বাহিনী রয়েছে। এটি তাদের দায়িত্ব। তারাই খুঁজে বের করুক, এসব টাকা পয়সা কোথায় যাচ্ছে? যাদের কাছে যাচ্ছে সেটি উদ্ঘাটন করুক এবং জনগণকে জানাক। প্রামান্য দলিল সহ যদি বিদেশ থেকে টাকা আসার ঘটনা প্রমাণিত হয় তাহলে সরকারের প্রয়োজন হবে না, জনগণই তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
জামায়াতের বিরুদ্ধে এমন অপবাদ অতীতে কেউ কোনো দিন দেয়নি। আর দেবেই বা কোত্থেকে? জামায়াত চলে তার কর্মী বাহিনীর কষ্টার্জিত আয় থেকে দলীয় ফান্ডে প্রদত্ত চাঁদা থেকে। এটি বড় কষ্টের টাকা। একজন পিয়ন থেকে শুরু করে অনেক বড় লোককে পর্যন্ত, যদি তারা জামায়াতের রোকন হন, তাদেরকে মাসিক ইনকামের একটি অংশ দলকে দিতে হয়। তেমন একটি সৎ এবং স্বচ্ছ দলের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপবাদকে জামায়াত কোনো অবস্থাতেই মেনে নিতে পারে না। তাই জনগনের দাবি, অন্যদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী যা মনে হয় তা বলতে পারেন। সেটি নিয়ে জামায়াতের কোনো মাথা ব্যাথা নাই। কিন্তু জামায়াত সম্পর্কে এমন ইলজাম জামায়াত কোনো অবস্থায় গ্রহন করতে পারে না।
আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব? সেটিও আবার আওয়ামী লীগের সাথে? শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রে বিএনপি ও জামায়াত সহ দেশের প্রায় সমস্ত বিরোধী দলই অকথ্য নির্যাতন ভোগ করেছে। দেশের বড় দল হিসাবে বিএনপিও সেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু জামায়াত জোর দিয়ে বলতে পারে যে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরতন্ত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক জুলুমের শিকার হয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির। জামায়াতে ইসলামীর ৫ জন শীর্ষ নেতাকে শেখ হাসিনা মিথ্যা মামলায় সাজানো সাক্ষি দিয়ে অপ্রমাণিত অভিযোগে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়েছেন। মওলানা দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীকে যাজ্জবীন কারাদণ্ড দিলেও বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হয়েছে। জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের হাজার হাজার কর্মীকে অমানুষিক শারিরীক নির্যাতন করে পঙ্গু করা হয়েছে। আয়না ঘরের বিভৎস নির্যাতন করা হয়েছে প্রধানত জামায়াত ও শিবিরের কর্মীদের ওপর। বছরের পর বছর জামায়াত ও শিবিরকে রাস্তায় বের হতে দেয়া হয়নি।
আল্লামা দেলোওয়ার হোসাইন সাঈদীর দণ্ডাদেশ শোনার পর হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তাদের ওপর পুলিশ নির্বিচার গুলী চালিয়ে কম করে হলেও ১৬৩ জন মানুষকে হত্যা করেছে। কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিলো। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ করে সেখান থেকে চাপ দিয়ে আইন পরিবর্তন করে সেই যাবজ্জীবনকে মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তরিত করা হয়েছিলো।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতের জনসভায় আওয়ামী লীগ ও বামেরা ৭ জন তরতাজা জামায়াত ও শিবির কর্মীকে লাঠিপেটা করে অসংখ্য মানুষ এবং পুলিশের সামনে হত্যাকরে এবং লাশের ওপর নর্তন কুর্দন করে।
জামায়াতের ওপর আওয়ামী নির্যাতনের কাহিনী বলে শেষ করা যাবে না। সব কাহিনী লিখতে গেলে একটি মহাকাব্য হয়ে যাবে। বিএনপির প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তৃনমূলের কর্মীরাও জেনে রাখুন, জামায়াত এবং শিবির আর যাই করুক, তাদের জীবন গেলেও তারা আওয়ামী লীগ এবং ভারতের সাথে কোনো দিন আঁতাত করবে না এবং হাত মেলাবে না। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার এবং ভারতীয় প্রভুত্বকে প্রতিরোধ করার জন্য জামায়াত এবং শিবির জীবন দিয়ে হলেও লড়বে। ভারত এবং আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের কোনো আপস নাই।
