কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলেই দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির দাবি, ত্রিমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে একচেটিয়াভাবে মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর করে তোলায় বিগত সরকারের ভুল নীতির প্রভাবেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও প্রাণহানি বেড়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ছিল নৌপথ ও রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় এ দুই মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ চলাচল করতেন, আর সড়কপথ ব্যবহার করতেন প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ। সে সময় সড়ক দুর্ঘটনাও তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
মোজাম্মেল হক দাবি করেন, স্বাধীনতার পর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রভাব এবং সরকারের ভুল নীতির কারণে বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে রেল ও নৌপথকে ক্রমেই সংকুচিত করা হয়। একই সঙ্গে নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর করে তোলা হয়েছে।
তার অভিযোগ, এ নীতির পাশাপাশি দুর্নীতি, পরিবহন খাতে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে সড়কে প্রাণহানির দায় অতীতের সব সরকারকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সড়ক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার চাঁদাবাজির কারণে সড়কে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তার দাবি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতি, অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ এবং অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়াসহ নানা কারণে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।
সংগঠনটির দাবি, এ তথ্য শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি; হাসপাতালগুলোর প্রকৃত চিত্র বিবেচনায় হতাহত মানুষের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি হতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের চলমান বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেশি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও পরিবহন খাতে দীর্ঘদিন ধরে দূরদর্শী পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের অভাবে নিরাপদ নৌ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়ানোর পরিবর্তে সড়ক সম্প্রসারণ ও সড়কভিত্তিক বিনিয়োগকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় সড়কের ওপর একচেটিয়া চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, সড়কে যাত্রীচাপ বাড়লেও সে অনুপাতে ম্যাস ট্রানজিট বা ডেডিকেটেড বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়নি। ফলে উন্নত গণপরিবহনের অভাবে প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই সংকটকে পুঁজি করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন-করিমন এবং বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তিত যানবাহন যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে—
০১) মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি এবং অবাধ চলাচল।
০২) সড়কে পর্যাপ্ত মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডারের অভাব এবং গাছপালার কারণে অন্ধ বাঁক সৃষ্টি।
০৩) মহাসড়ক নির্মাণে ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য।
০৪) উল্টো পথে যানবাহন চলাচল, সড়কে চাঁদাবাজি এবং পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন।
০৫) অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন।
০৬) বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। সংগঠনটির সুপারিশগুলো হলো—
০১) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বিআরটিএকে আমলানির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা।
০২) উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
০৩) প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা।
০৪) আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ চালক তৈরি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান নিশ্চিত করা।
০৫) গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ করা।
০৬) কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং চালকদের বেতন-ভাতা ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা।
০৭) মহাসড়কে নিরাপদ পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন করা।
০৮) মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত রোড সেফটি অডিট পরিচালনা করা।
০৯) যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রদানের পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ (স্ক্র্যাপ) করা।
১০) নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা।
