পারুল চৌধুরী। পাঁচ হাজার মিটার দৌড় এবং তিন হাজার মিটার স্টিপলচেজে ব্রোঞ্জ। গুলবীর সিং। দেড় হাজার মিটার এবং দশ হাজার মিটার দৌড়ে রুপো। পাঁচ হাজার মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জ। প্রথম ভারতীয় পুরুষ হিসেবে এশিয়ান গেমসের এক সংস্করণে পদকের হ্যাটট্রিক। সাওয়ান বেরওয়াল। ম্যারাথনে ব্যক্তিগত সেরা সময় করে রুপো। ভারতের দীর্ঘ ৪৪ বছরের খরা কাটল যে পদকে। সীমা কুমারী। দশ হাজার মিটার দৌড়ে ব্রোঞ্জ। ১৬ বছর পর এই ইভেন্টে ফের পোডিয়ামে ভারতের কোনও মহিলা অ্যাথলিট।
এবারের নাগোয়ায় এশিয়ান গেমসে অ্যাথলেটিক্সের ট্র্যাক বিভাগে পনেরোটা পদক এসেছে ভারতের ঝুলিতে। যার মধ্যে মধ্য এবং দূরপাল্লার দৌড়ের বিভিন্ন ইভেন্টেই এসেছে সাত-সাতটি পদক। আর সেই সাত সাফল্যের সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন এক বঙ্গসন্তান। কল্যাণ চৌধুরী। প্রতিযোগিতায় ভারতীয় অ্যাথলেটিক্স দলের অন্যতম ডেপুটি চিফ কোচের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন যিনি। মূলত ৮০০ মিটার দৌড় থেকে ম্যারাথন পর্যন্ত ট্র্যাকের সব ইভেন্টই রয়েছে তাঁর অধীনে। শিষ্যদের সাফল্যে উচ্ছ্বাস গোপন করছেন না এই বাঙালি গুরু। কল্যাণ বলছিলেন, “এই ছেলেমেয়েরা সারাবছর অসম্ভব পরিশ্রম করে। বাড়ি পর্যন্ত যায় না। কোচ, ফিজিও, ফিজিক্যাল ট্রেনার, ডাক্তার, ডায়েটিশিয়ানরা যা বলে, অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। ফলে এশিয়ান গেমসের মতো মঞ্চে ওদের সাফল্য দেখতে আমাদেরও ভালো লাগে।” গত সংস্করণের তুলনায় এবার এশিয়াড অ্যাথলেটিক্সে ভারতের সোনার সংখ্যা কমেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি পদকের জন্য ‘শর্টকাট’ বেছে না নিলে পারুল-গুলবীরদের পদকের রং বদলে যেত বলেও আত্মবিশ্বাসী কল্যাণ। “পদকের লোভে বাহরিন, কাতারের মতো দেশগুলি আফ্রিকান অ্যাথলিটদের অর্থ দিয়ে নাগরিক হিসেবে নিয়ে এসেছে। না হলে আমাদের পারফরম্যান্স আরও ভালো হত।”
হিন্দমোটরের আদি বাসিন্দা কল্যাণ প্রায় চার দশক ধরে অ্যাথলেটিক্সের কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে। পাতিয়ালা সাইয়ে কেরিয়ার শুরুর পর দীর্ঘদিন ছিলেন কলকাতা কেন্দ্রের দায়িত্বে। পরে চলে যান বেঙ্গালুরু, সাইয়ের উৎকর্ষ কেন্দ্রে। সাই থেকে অবসরের পর সরাসরি জাতীয় অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের অধীনে কাজ করছেন এখন। বেঙ্গালুরুতে পারুল কল্যাণের অধীনেই অনুশীলন করেন। গুলবীররা এক সময় তাঁর কোচিংয়ে থাকলেও বর্তমানে কলোরাডো স্প্রিংয়ে ট্রেনিং করেন। কল্যাণের কথায় , “পারুল এখনও আমার কোচিংয়ে আছে। তবে গুলবীর কলোরাডোয় গিয়েছে। আসলে দেশে হাই অল্টিটিউড ট্রেনিংয়ের সুবিধা নেই তেমন। ফলে দূরপাল্লার দৌড়ের জন্য বিদেশের যেতে হয় অ্যাথলিটদের। এখন অবশ্য কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আশা করছি আগামীতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে।” তবে এশিয়াডের আগে জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো ব্যবহার করে প্রস্তুতি সেরেছে টিম ইন্ডিয়া। তখন থেকে ফের নির্দিষ্ট কয়েকটি ইভেন্টের অ্যাথলিটরা রয়েছেন কল্যাণের নজরদারিতেই। পদক জয়ের পথে বেশ কিছু অ্যাথলিট নিজের সেরা পারফরম্যান্সও করেছেন চলতি এশিয়াডে। যা বাড়তি তৃপ্তি দিচ্ছে কোচ কল্যাণকে।
তবে এত সাফল্যের মধ্যে একটা বিষয়ে আক্ষেপও রয়েছে কল্যাণের। এখন আর সেভাবে অ্যাথলিট উঠছে না তাঁর রাজ্য থেকে। জ্যোতির্ময়ী শিকদার, সোমা বিশ্বাস, পিংকি প্রামাণিক, স্বপ্না বর্মনের বাংলায় শুধুই শূন্যতা। কল্যাণের বার্তা, “কয়েকটা এশিয়াড আগেও কত বাঙালি থাকত দলে। পদক জিতত। এখন তো জাতীয়স্তরেই সেভাবে বাঙালি অ্যাথলিট নেই। যদি পরিকাঠামো দেওয়া হয়, তবে আমি দায়িত্ব নিতে তৈরি। সব ছেড়ে চলে আস ডাক পেলে।” নিজের রাজ্যে ফের অ্যাথলিট তৈরির সুযোগেরই অপেক্ষায় রয়েছেন এই বাঙালি কোচ।
