বয়সের বার্ধক্যকে পেছনে ফেলে ডিজিটাল দুনিয়ায় বাজিমাত করছেন একদল প্রবীণ নারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের রকমারি বিনোদনমূলক ও অনুপ্রেরণাদায়ক কনটেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে নতুন প্রজন্মের বিপুল প্রশংসা কুড়াচ্ছেন তারা। ফ্যাশন, জীবনযাপন কিংবা ঘরোয়া রান্নার অনন্য সব অভিজ্ঞতা শেয়ার করে কোটি অনুসারী গড়ে তুলেছেন এই দাদিমা বয়সের ইনফ্লুয়েন্সারেরা। অনুসারী ও ভিউয়ের হিসাব রাখেন খাতায়।
নেটদুনিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব লিলিয়ান দ্রোনিয়াক, যাকে সবাই চেনেন ‘গ্র্যান্ডমা দ্রোনিয়াক’ নামে। বর্তমানে ৯৬ বছর বয়সে পা রাখা এই নারী কেবল হাস্যরসাত্মক ভিডিও ও প্রাণবন্ত জীবনযাত্রার গল্প উপহার দিয়ে সমাজমাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি অনুসারী অর্জন করেছেন। ২০২০ সালে মূলত অবসর জীবনের একঘেয়েমি ঘোচাতে নাতির সহযোগিতায় তিনি ভিডিও বানানো শুরু করেছিলেন। সেই বিনোদনমূলক কাজই পরবর্তীতে তার আয়ের বিশাল উৎসে পরিণত হয়। শুরুটা হয়েছিল মূলত অবসর সময়ের একঘেয়েমি কাটাতে। তরুণদের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চান তিনি। কাজের ব্যাপারে তিনি বেশ নিয়মানুবর্তী। তাই ব্র্যান্ডগুলোর কাছে তাঁরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ন।
প্রবীণ এই ইনফ্লুয়েন্সার এখন বিভিন্ন স্বনামধন্য বিউটি ও ফুড ব্র্যান্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে তার আয় হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার মার্কিন ডলার। এই আয়ের অর্থ দিয়ে তিনি নিজের পরিচর্যাকেন্দ্রের যাবতীয় খরচ মেটান এবং নাতির সন্তানদের পড়াশোনার তহবিল গড়ছেন। গ্র্যান্ডমা দ্রোনিয়াকের স্পষ্ট বার্তা—বয়স কখনোই জীবনকে থামিয়ে দেয় না, যেকোনো বয়সেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বেঁচে থাকা সম্ভব। এই অর্থ দিয়ে নিজের পরিচর্যাকেন্দ্রের খরচ মেটানোর পাশাপাশি প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীদের পড়াশোনার জন্যও সঞ্চয় করছেন। বয়স্ক মানুষও আনন্দ করতে পারেন, বাইরে যেতে পারেন, নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতে পারেন। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করলেও নিজের নাম যুক্ত করার আগে বিষয়টি ভালোভাবে ভেবে দেখেন।
যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ অঞ্চলের ৮২ বছর বয়সী বাসিন্দা ভিভ ট্রুরানও নিজের রঙিন ফ্যাশন ধারার মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন। স্বামীবিয়োগের পর প্রতিবেশীর অনুপ্রেরণায় নিজের পোশাকের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী সংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়ে গেছে। নিজের শোবার ঘরটিকে স্টুডিও বানিয়ে দৈনিক দুটি করে ভিডিও বানিয়ে আপলোড করেন তিনি।
ভিভ ট্রুরানের ঝুলিতে রয়েছে দুটি ড্রয়ার ভর্তি স্কার্ফ এবং অন্তত ২২ জোড়া বিশেষ চশমা, যা তিনি কনটেন্টে প্রদর্শন করেন। প্রতিদিন সকালে উঠে দিনের প্রথম ভিডিও পোস্ট না করা পর্যন্ত তিনি ঘর থেকে বের হন না। ভিডিওর ভিউ ও অনুসারীর হিসাব হাতে লিখে সংরক্ষণ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচটি খাতা শেষ করেছেন তিনি। তাকে নিয়মিত অনুসরণ করা এক তরুণী জানান, বয়স বেড়ে যাওয়া নিয়ে তার ভেতর যে ভীতি ছিল, ট্রুরানের ভিডিও তা বদলে দিয়েছে এবং বুঝিয়েছে বয়স বাড়লেও জীবনের উজ্জ্বলতা কমে যায় না। তাঁর রয়েছে ২২ জোড়া চশমা ও স্কার্ফে ভরা দুটি ড্রয়ার। তাকে নিয়মিত ফলো করেন এমন একজন তরুণী জানিয়েছে, আমি বয়স বাড়াকে ভয় পেতাম। তাঁর মতে, বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না। এরই মধ্যে সেই হিসাবের জন্য পাঁচটি খাতা পূর্ণ হয়েছে। তিনি বোঝাতে পেরেছেন বয়স বাড়া মানেই জীবন থেকে রং হারিয়ে যাওয়া নয়। তাঁদের অনেক অনুসারীর ক্রয়ক্ষমতাও রয়েছে।
কাজের ক্ষেত্রে নীতিবোধকে প্রাধান্য দেওয়া ট্রুরান সব ব্র্যান্ডের প্রচারণায় অংশ নেন না। বরঞ্চ স্থানীয় ব্র্যান্ড ও দাতব্য সংস্থাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন এবং নীতিবিরোধী হলে মোটা অঙ্কের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন। একই ধরনের অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা নিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন ‘ইন্টারনেটের ইতালীয় দাদি’ নামে পরিচিত বারবারা কস্টেলোসহ নোনা গ্রেসির মতো একাধিক প্রবীণ কনটেন্ট সৃষ্টিকর্তা। বড় অঙ্কের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন, যদি ব্র্যান্ডটি তাঁর মূল্যবোধের সঙ্গে না মেলে।
প্রবীণ এই রন্ধনশিল্পী জানান, যেকোনো প্রথাগত চাকরির চেয়ে এই কাজে তিনি বেশি উপার্জন করছেন। তবে কেবল আর্থিক লাভই তার মূল লক্ষ্য নয়, বরং পরিবারের সবাইকে খাবারের টেবিলে একত্র করার ঐতিহ্যটি তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া তার মূল উদ্দেশ্য। একবার এক রেস্তোরাঁয় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীর সাথে দেখা হলে তিনি জানান, একা থাকা শুরু করার পর কস্টেলোর রান্নার বই তাকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে। এছাড়া বই উন্মোচন পর্বে সাবেক তরুণ শিক্ষার্থীদের তাদের সন্তানদের নিয়ে উপস্থিত হতে দেখে তিনি দারুণ আবেগাপ্লুত হন। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষের ভালোবাসার বার্তা পেলে এখনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং সংস্থা ‘উই আর সোশ্যাল’-এর কর্মকর্তা নাওমি বার্কার উল্লেখ করেছেন, প্রবীণ নির্মাতাদের কনটেন্টে বাস্তব জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিখাদ আন্তরিকতা থাকে। অনিশ্চিত জীবনে তাদের ভিডিওগুলো তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি দেয়। বিশেষত যারা স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকেন, তারা এই প্রবীণ নারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘ভার্চুয়াল দাদি’ খুঁজে পান। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব নির্মাতাদের অনুসারীদের ভালো ক্রয়ক্ষমতা থাকায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড তাদের ওপর বিশেষ আস্থা রাখছে। কখনো রঙিন পোশাক, কখনো চশমা, আবার কখনো স্কার্ফের সংগ্রহ তুলে ধরেন অনুসারীদের সামনে। কেউ ফ্যাশনে, কেউ রান্নায়, কেউ আবার দৈনন্দিন জীবনের সহজ কিছু পরামর্শ দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
ডিজিটাল দুনিয়ায় সফল হতে বয়স বা তরুণ হওয়া যে কোনো শর্ত নয়, তা প্রমাণ করেছেন গ্র্যান্ডমা দ্রোনিয়াক, ভিভ ট্রুরান ও বারবারা কস্টেলোরা। নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য, রুচিবোধ এবং জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো বয়সে যে নতুন ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব, সামাজিক মাধ্যমে এই প্রবীণ নারীদের জোয়ার তারই নতুন বার্তা দিচ্ছে।
The post সামাজিক মাধ্যমে সাড়া ফেলছেন প্রবীণ ইনফ্লুয়েন্সারেরা, অনুসারী ছাড়িয়েছে কোটি appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
