পবিত্র নগরী মক্কায় ৬ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালের বেশি বিনিয়োগ করেছে ইন্দোনেশিয়ার দানান্তারা। বিপুল বিনিয়োগে ইন্দোনেশিয়া মক্কার থাখের এলাকায় ১ হাজার ৪৬১ কক্ষের নোভোটেল হোটেল এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নকাজের জন্য ১৪টি জমি কেনার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
হজ-উমরাকেন্দ্রিক হোটেল, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও খুচরা ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। দানান্তারা ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট এজেন্সি, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পবিত্র নগরীতে সৌদি নাগরিক নন- এমন ব্যক্তিদের সম্পত্তির মালিকানা অর্জনের সুযোগসংক্রান্ত হালনাগাদ নতুন আইন করার পর বড় বিনিয়োগগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এর মাধ্যমে আগে থেকেই নির্মিত একটি হোটেলের মালিকানা অর্জনের পাশাপাশি মক্কায় হোটেল ও খুচরা ব্যবসাকেন্দ্রিক সম্পদের পরিসর বাড়াতে যাচ্ছে দানান্তারা।
অ্যারাবিয়ান বিজনেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মসজিদে হারাম থেকে প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার উত্তরে থাখের মক্কা উন্নয়ন প্রকল্পে এসব সম্পত্তি অবস্থিত। প্রকল্পটির প্রধান উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান থাখের ডেভেলপমেন্ট ১৯ অক্টোবর সম্পত্তির মালিকানাসংক্রান্ত সনদ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
থাখের ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি সৌদি আরবের সুপরিচিত রিয়েল এস্টেট এবং আবাসন উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি মক্কা নগরীতে আবাসন, বাণিজ্যিক এবং হোটেল খাতের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
দানান্তারা ইন্দোনেশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, হোটেলটির অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর সম্পন্ন হয় ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট। সংলগ্ন জমি কেনার প্রক্রিয়া শেষ হয় ১৮ অক্টোবর।
প্রায় ৪৪ হাজার ৮৮ বর্গমিটার আয়তনের ১৪টি জমিতে প্রায় ৬ হাজার নতুন হোটেলকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে দানান্তারার। পাশাপাশি ৯০টির বেশি দোকান নিয়ে একটি শপিং মল ও প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
থাখের ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, নতুন সম্প্রসারণ প্রকল্পে আরও ২ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এ অর্থ হোটেল ও জমি কেনার জন্য ইতিমধ্যে ব্যয় করা অর্থের অতিরিক্ত।
দানান্তারার স্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী আল-খুমাসিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে ধাপে ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্সের শর্ত পূরণ করতে হবে।
বর্তমান নোভোটেল থাখের মক্কা তিনটি ১৯ তলাবিশিষ্ট টাওয়ার নিয়ে গঠিত। এতে রয়েছে ১ হাজার ৪৬১টি কক্ষ ও সুইট। হোটেলটির পরিচালনার দায়িত্ব আগের চুক্তি অনুযায়ী অ্যাকর গ্রুপের হাতেই থাকবে।
থাখের ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, হজ মৌসুমে হোটেলটিতে একসঙ্গে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হজযাত্রীর থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশ। ২০২৬ সালে দেশটির নিয়মিত হজযাত্রীর কোটা ২ লাখ ৩ হাজার ৩২০। থাখের ডেভেলপমেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশটি থেকে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ উমরা পালন করেন।
এ বিনিয়োগের মাধ্যমে মক্কায় দীর্ঘমেয়াদি হোটেল ব্যবসায় উপস্থিতি বাড়াতে চায় দানান্তারা। মৌসুমি আবাসন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে নিজস্ব হোটেল ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পের সমন্বয়ে হজ-উমরাযাত্রীদের জন্য আবাসন ও অন্যান্য সেবা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।
দানান্তারা ইন্দোনেশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রোসান রোসলানি বলেন, এ অর্জন সৌদি আরবে দীর্ঘমেয়াদি হোটেল বিনিয়োগের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি বাস্তব পদক্ষেপ। বিনিয়োগের শৃঙ্খলা বজায় রেখে সম্পদগুলো পরিচালনা এবং ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হজ-উমরাযাত্রীদের আবাসন ও সেবার মান উন্নত করতে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেবে প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি আরও বলেন, এ বিনিয়োগ ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে। মদিনাসহ সৌদি আরবের অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখা হবে।
সৌদি আরবে বিদেশি নাগরিকদের সম্পত্তির মালিকানা অর্জনসংক্রান্ত নতুন আইন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়ার পর মক্কায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছে থাখের ডেভেলপমেন্ট।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল শাকের বলেন, থাখের মক্কার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাদের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পত্তির মালিকানা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারদের জন্য মক্কা উন্মুক্ত করার উদ্যোগের প্রতিফলন।
থাখের মক্কা উন্নয়ন প্রকল্পের আয়তন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রকল্পটির মোট বিনিয়োগমূল্য ২৬ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালের বেশি, যা প্রায় ৬ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। প্রকল্পের বিদ্যমান হোটেলগুলোতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কক্ষ ও সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।
দানান্তারার পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন উন্নয়নকাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে হজ-উমরাযাত্রীদের আবাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সেবা ও বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
মক্কার এই অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের ধর্মীয় পর্যটন ও হোটেল খাতে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। ভবিষ্যতে মদিনা ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে দেশটির তহবিলটি।
