রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নবনির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিরোধী দল যদি স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করে দেয়, তাহলে তা হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গাদ্দারি। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলকে রাস্তা অবরোধ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে জনজীবন ব্যাহত না করে সংসদে সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল ১০টার দিকে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
একই অনুষ্ঠানে আধুনিকায়ন করা ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানেরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণের পর প্রধানমন্ত্রী উদ্যানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং সেখানে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
বিরোধী দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও অনুষ্ঠানে তাঁদের অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের দূরত্ব থাকতেই পারে। কিন্তু যাঁদের আত্মত্যাগ, আহত হওয়া ও চোখ হারানোর বিনিময়ে বিরোধী দলের নেতারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন, সেই শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁদের উপস্থিত থাকা উচিত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করলে অনুষ্ঠানে এসে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসতে পারত। বিএনপি যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও ধারণ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সরকার জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে করে যাচ্ছে।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিরোধী দলের বক্তব্য থাকতে পারে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই জনগণ সরকার ও বিরোধী দলকে সংসদে পাঠিয়েছে। জনগণ দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। তাই রাস্তা অবরোধ করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না করার আহ্বান জানান তিনি।
সরকার গঠনের পর পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথম কয়েক দিন ফজরের নামাজের পর কিছু মানুষকে ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে দেখা গেলেও এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। দেশের স্বার্থে সবাইকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পত্রপত্রিকায় ডেঙ্গুতে বহু মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর আসছে। গত প্রায় দেড় মাস ধরে সরকারের উদ্যোগে বহু মানুষকে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে, যাতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যায়। এডিস মশা সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল চিনে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৮৩৪ শহীদের নাম খোদাই স্মৃতিস্তম্ভে
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে ওসমানী উদ্যানে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। এর সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে রয়েছে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু একটি রিলিফ ভাস্কর্য। ভেতরে রয়েছে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু আরেকটি রিলিফ ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাজধানীর নাগরিক পরিবেশের উন্নয়নের লক্ষ্যেই স্মৃতিস্তম্ভ ও উদ্যান আধুনিকায়নের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
আধুনিকায়নে বদলে গেল ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যান
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানো এবং সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।
উদ্যানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, গাড়ি রাখার জায়গা ও জলাশয়ের ঘাট। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা। দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটিতে সড়ক থেকে দুই মিটার উঁচুতে দ্রুত চলাচলের পথও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
সানা/আপ্র/১৯/১০/২০২৬
