বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও জনবিক্ষোভের উত্তাপের মধ্যে এবার উত্তাল হয়ে উঠেছে উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র দুর্বল করা, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে রাজধানীতে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। শনিবারের এই বিক্ষোভকে দেশটিতে কয়েক বছরের মধ্যে প্রেসিডেন্টবিরোধী সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশটির বৃহত্তম শ্রমিক ইউনিয়ন ইউজিটিটি (ইউজিটিটি) এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজের সংগঠনের নেতৃত্বে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক সংকট, জনসেবার অবনতি, ঘন ঘন পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকা এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
২০২১ ও ২০২২ সালে ব্যাপক ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন সাঈদ। তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেন, কয়েক ডজন বিচারককে বরখাস্ত করেন এবং ডিক্রির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। তার বিরোধীরা এসব পদক্ষেপকে অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যা দেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাঈদ নাগরিক সমাজের সংগঠন, সাংবাদিক ও বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন আরও জোরদার করেছেন। তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সাঈদ বলেন, তিনি কোনো স্বৈরশাসক নন। তার অভিযোগ, বিরোধীরা সামাজিক অস্থিরতা উসকে দিতে পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।
রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিরোধী দল, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বেকার মানুষ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এবারের বিক্ষোভে একত্র হন। তারা রাজধানীর হাবিব বুরগুইবা অ্যাভিনিউ ধরে মিছিল করেন। ২০১১ সালের বিক্ষোভের সময়ও এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ওই আন্দোলন আরব বসন্তের গণঅভ্যুত্থানগুলোর সূচনা ত্বরান্বিত করেছিল।
বছরের পর বছর ধরে বিরোধীদের মধ্যে বিভক্তি থাকায় বড় জমায়েত গড়ে তোলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে এবারের বিক্ষোভ প্রেসিডেন্ট সাঈদের জন্য উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমাবেশে ইউজিটিটির প্রধান সালাহ এদ্দিন সালমি বলেন, “নীরবতা আর মেনে নেওয়া হবে না। সব ক্ষমতা একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না।”
বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীজুড়ে শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, “ভয় নেই, ক্ষমতা জনগণের হাতে!” এবং “কারাগার ভরা, মানুষ ক্ষুধার্ত!” তারা ২০১১ সালের আন্দোলনের বহুল পরিচিত স্লোগান—“জনগণ এই শাসনব্যবস্থার পতন চায়!”—আবারও সামনে আনেন।
বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট সাঈদের সমালোচকদের মুক্তি দাবি করেন। পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কথিত হামলা বন্ধের আহ্বান জানান তারা। বেকারত্ব ও দূষণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেককে ব্যানার বহন করতেও দেখা যায়।
রাজধানী তিউনিস থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত স্ফ্যাক্স শহর থেকে আসা বিক্ষোভকারী ইয়াসিন ঘারসেলি বলেন, “অনেক হয়েছে! দেশ ধসে পড়ছে। আমরা বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ভুগছি, আর একের পর এক সংকট তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “নিজের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে আমি স্ফ্যাক্স থেকে এসেছি। দেশের শেষ কণ্ঠস্বর হয়ে গেলেও আমি হাল ছাড়ব না।”
সূত্র: রয়টার্স
