জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) গত আড়াই মাসে তিন দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থীর মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ ১৪ অক্টোবর সংঘর্ষে আহত পাঁচ শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনকে আইসিইউ বা গুরুতর অবস্থায় অস্ত্রোপচার করাতে হলেও আগের দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের এই ধারাবাহিক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ জুলাই ছাত্ররাজনীতির হিসাব-নিকাশকে কেন্দ্র করে অগ্নিবীণা হলের ডাইনিংয়ে রিজওয়ানুল করিম রাব্বি নামের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর একই পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী তামজিদ আহমেদ লাবিব গুরুতর আহত হন। তাঁর মাথায় ছয়টি সেলাই দিতে হয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ওই দুই বড় ঘটনার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা প্রক্টরিয়াল টিম কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটে সর্বশেষ গত ১৪ অক্টোবর। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলাকালে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সন্ধ্যার দিকে দুই দফায় চলা এই সংঘর্ষে অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। এদের মধ্যে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী রুবিউল ও সাকিবের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় তাদের অস্ত্রোপচার করতে হয়। প্রথমে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত হলেও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া এই সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আরটিভি’ প্রতিনিধি আবু তাহের মণ্ডলের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ধারণকৃত ভিডিও জোরপূর্বক মুছে ফেলারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ এই বড় সহিংসতার পর গত ১৫ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিদ্রোহী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলামকে কমিটির আহ্বায়ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানকে সদস্য-সচিব করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তবে তদন্ত কমিটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, সর্বশেষ সংঘর্ষের সময় প্রক্টর স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি, তখন তাঁকেই আবার তদন্ত কমিটির সদস্য-সচিব করা হয়েছে। এটি তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিগত ঘটনাগুলোতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিলে হয়তো এই বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হতো। তাই শুধু এবারের সংঘর্ষে জড়িতদের শাস্তি দিলেই চলবে না, বরং পূর্বের ঘটনাগুলোতে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ এবং প্রক্টরিয়াল বডির কোনো দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না—তাও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখতে হবে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব
