ঢাকাই চলচ্চিত্রের বাজার এখন অনেকটাই উৎসব ও বড় তারকা-নির্ভর। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সিনেমায় কলকাতার নায়িকাদের অভিনয় করার ধুম পড়েছে। ওপার বাংলার অনেক অভিনেত্রীই এ দেশের রুপালি পর্দায় নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে আসছেন। তবে ঢাকার টিকিট উইন্ডো আর দর্শক হৃদয় জয় করা যে সবার পক্ষে সম্ভব নয়Ñচলতি বছর তা আবারও প্রমাণিত হলো। এ বছর ঢাকাই সিনেমায় অভিষেক হওয়া কলকাতার দুই নায়িকা জ্যোতির্ময়ী কু-ু ও সুষ্মিতা চ্যাটার্জি বক্স অফিস ও দর্শক আলোচনা, উভয় ক্ষেত্রেই পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ বছর তিনেক আগে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমা দিয়ে ওপার বাংলার ইধিকা পাল এ দেশের দর্শকের চোখে ‘মেগাস্টার’ বনে গিয়েছিলেন।
ঢাকাই সিনেমার ‘কিং খান’ খ্যাত শাকিব খানের নায়িকা হওয়া মানেই ক্যারিয়ারে রাতারাতি বড়সড় লাফ। এই সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন ওপার বাংলার ছোট পর্দার পরিচিত মুখ জ্যোতির্ময়ী কু-ু। চলতি বছরের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া শাকিব খানের বিগ বাজেটের সিনেমা ‘প্রিন্স’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় এবং ঢাকার বাজারে তার অভিষেক হয়। সিনেমাটি মুক্তির আগে কলকাতার এই মডেল-অভিনেত্রীকে নিয়ে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সিনেমা মুক্তির পর সেই উন্মাদনা কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
‘প্রিন্স’ সিনেমাতে শাকিবের মূল নায়িকা তাসনিয়া ফারিণের পাশে জ্যোতির্ময়ীর চরিত্রটি ছিল একেবারেই ম্লান। দুর্বল চিত্রনাট্য এবং অভিনয়ের খামতির কারণে শাকিব খানের সিনেমার নায়িকা হয়েও দর্শকদের মনে কোনো ছাপ ফেলতে পারেননি তিনি। সিনেমাটি ব্যবসায়িক দিক থেকেও প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় জ্যোতির্ময়ীর অভিষেক অধ্যায়টি এক প্রকার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
কলকাতার বাণিজ্যিক ধারার সিনেমায় সুষ্মিতা চ্যাটার্জি অন্যতম পরিচিত মুখ। এ বছর ঢাকার ‘রাক্ষস’ নামে বড় প্রজেক্টের মাধ্যমে তার অভিষেক ঘটেছিল। মুক্তির আগে সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা হলেও প্রেক্ষাগৃহে আসার পর এটি দর্শকদের টানতে ব্যর্থ হয়। সুষ্মিতার গ্ল্যামারাস উপস্থিতি থাকলেও অভিনয়ের গভীরতা বা চরিত্রের সঙ্গে তার সংযোগ এ দেশের সিনেমা প্রেমীদের মন ছুঁতে পারেনি। ফলে নীরবেই পার হয়ে গেছে তার ঢাকাই সিনেমার প্রথম মিশন।
কলকাতার নায়িকাদের এই ব্যর্থতার পিঠে বারবার ঘুরেফিরে আসছে ইধিকা পালের নাম। ২০২৩ সালে শাকিব খানের বিপরীতে ‘প্রিয়তমা’ সিনেমা দিয়ে তার অভিষেক হয়েছিল। ইধিকা কলকাতায় সিরিয়ালের অভিনেত্রী হলেও তার সহজ-সরল অভিনয়, দুর্দান্ত স্ক্রিন প্রেজেন্স এবং সিনেমার ‘ইতি’ চরিত্রের আবেগ ঢাকাই দর্শককে বুঁদ করে রেখেছিল। ‘প্রিয়তমা’র ব্লকবাস্টার সাফল্যের পর ইধিকা রাতারাতি এ দেশের দর্শকের চোখের মণি হয়ে ওঠেন। এমনকি ওপার বাংলার বড় বড় তারকা যেমন মিমি চক্রবর্তী, দর্শনা বণিক বা কৌশানি মুখার্জিরাও এসে যে ঝড় তুলতে পারেননি, ইধিকা তা করে দেখিয়েছেন।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, অনেক সময় ওপার বাংলার নায়িকাদের কেবল ‘শো-পিস’ বা গ্ল্যামার যুক্ত করার জন্য সিনেমায় নেওয়া হয়। জ্যোতির্ময়ীর ক্ষেত্রেও ‘প্রিন্স’ সিনেমাতে শক্তিশালী কোনো ক্যারেক্টার আর্ক ছিল না। শুধু ওপার বাংলার মুখ হলেই দর্শকরা গ্রহণ করেন না। চরিত্রের সঙ্গে দেশের দর্শকের আবেগ মিশে না গেলে সেই সিনেমা বা অভিনয় স্থায়ী হয় না। কলকাতার অনেক নায়িকা একই ঢংয়ের অভিনয় এ দেশেও উপহার দিচ্ছেন, যা দর্শকরা সহজেই ধরে ফেলছেন।
ঢাকাই সিনেমার দরজা ওপার বাংলার শিল্পীদের জন্য সবসময়ই উন্মুক্ত। তবে জ্যোতির্ময়ী কু-ু ও সুষ্মিতা চ্যাটার্জির এই ব্যর্থতা প্রমাণ করেÑটিকিট কেটে হলে আসা দর্শককে ধরে রাখতে হলে শুধু কলকাতার ট্যাগলাইন নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী গল্প এবং সাবলীল অভিনয়। দেখার বিষয়, আগামীতে এই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওপার বাংলার অন্য কোনো নতুন মুখ ইধিকার মতো এ দেশের দর্শকদের মন জয় করতে পারেন কিনা।
