আমার সফরনামা দীর্ঘায়িত হয়ে যাওয়ায় পাঠক পাঠিকাদের কাছ থেকে আমি দু’রকমের প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। কেউ কেউ পাকিস্তান সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানানোর জন্য অনুরোধ করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন যে এ লেখাকে দীর্ঘায়িত না করে সমসাময়িক বিষয়ে ফিরে আসাই উত্তম।
নবম কিস্তি
আমার সফরনামা দীর্ঘায়িত হয়ে যাওয়ায় পাঠক পাঠিকাদের কাছ থেকে আমি দু’রকমের প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। কেউ কেউ পাকিস্তান সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানানোর জন্য অনুরোধ করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন যে এ লেখাকে দীর্ঘায়িত না করে সমসাময়িক বিষয়ে ফিরে আসাই উত্তম। কারণ পাকিস্তান সফরের ওপর পরবর্তীকালে পুস্তক রচনায় কোন বাধা নেই। আমি উভয়ের সেন্টিমেন্টকে সম্মান করি। বন্ধুবর ও আমার অগ্রজ প্রতিম জনাব ওসমান গনি আমাকে মাঝেমধ্যে কিছু পরামর্শ দেন এবং তার পরামর্শগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। আমি আগের লেখায় মুগল হেরেমের একজন মহীয়সী নারীর কথা লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম। তিনি হচ্ছেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী এবং সম্রাট আলমগীরের দাদি নুরজাহান। তিনিই মুগল সম্রাটদের স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র মহিলা যিনি মুগল প্রশাসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তার নামে রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন এবং রাজকীয় ফরমান তার স্বামী জাহাঙ্গীরের সাথে সাথে নিজের নামেও জারি করেছিলেন, তবে তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে এবং ইসলামী শরিয়া অনুসারী ব্যক্তি ছিলেন।
তার মাজারও লাহোরে অবস্থিত। লাহোরের শাহাদারা বাগের রাবি নদীর উত্তরে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কবরের পাশে সমাধিটি সম্রাজ্ঞি নুরজাহান তার জীবদ্দশায় তৈরি করেছিলেন (১৬৪৫ সাল)। ওই বছর ডিসেম্বর মাসে লাহোরে তিনি ইন্তিকাল করেন। নুরজাহানের প্রকৃত নাম ছিল মেহেরুন্নেসা। তার সমাধিতে ফারসি ভাষায় রচিত একটি কবিতার চারটি লাইন খোদিত আছে। লাইনগুলোর বাংলা হচ্ছে—
“গরীব গোরে দ্বীপ জ্বেলো না
ফুল দিও না কেউ ভুলে
শ্যামাপোকায় না পুড়ে পাখ দাগা না পায় বুলবুলে।”
মুগল সম্রাটদের মধ্যে অনেকেই বিলাসী জীবন ও রাজকোষের অর্থ নির্বিচারে ব্যয়ের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাদের এ অপচয়কে অনেকেই মুগল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এদের মধ্যে এমন সম্রাটও ছিলেন যিনি ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সরকারি কোষাগরের একটি পয়সাও ব্যয় না করার জন্য সুনাম অর্জন করেছে। তিনি ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। তিনি কুরআনের হাফেজ ছিলেন এবং দীর্ঘকাল মুগল সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। তিনি টুপি সেলাই করে এবং কুরআন শরীফ নকল করে যে অর্থ উপার্জন করতেন তা দিয়ে তার ভরণপোষণ চালাতেন। এমনকি তার দাফন কাফনের ব্যয়ও তিনি তার এ অর্জিত অর্থ থেকে বহন করার অসিয়ত করে গিয়েছিলেন এবং এ অর্থের পরিমাণ ছিল ১৪ টাকা ১২ আনা।
পাকিস্তান এক সময় অখণ্ড পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল বা পশ্চিম পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল তখন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনীতি ছিল অনেকটা পরিপূরক অর্থনীতি। বাংলাদেশ-পূর্ব পাকিস্তানের অনেক স্মৃতি এখনো পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়। দুটি অঞ্চলই মুসলিম প্রধান হওয়ায় উভয় দেশের মানুষের চালচলন, ধর্ম, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, হালাল হারামের ধারণা এবং জীবনদর্শন ও ইহকাল পরকালে বিশ্বাস প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ মিল রয়েছে। আগেই বলেছি যে, ৭১ উত্তর পাকিস্তান জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প সংস্কৃতি, সামরিক শক্তি, কৃষি, শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে এবং এখনো তারা ওই পথে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশও বসে ছিল না। এই দেশটি পাকিস্তান থেকে যখন আলাদা হয় তখন তার জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি এবং খাদ্য উৎপাদন বিশেষ করে দানা জাতীয় শস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল বার্ষিক প্রায় ৯৫ লক্ষ টন। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯ কোটির কাছাকাছি এবং তার বার্ষিক খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের অনেকগুলো পণ্যের আমদানি চাহিদাও বেড়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে সন্নিহিত প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত তাদের রপ্তানি পণ্যের একটি বিরাট বাজার হিসেবে বাংলাদেশকে দখল করে নিয়েছে। তাদের এ দখলদারিত্ব ছিল আধিপত্যবাদ ভিত্তিক। তারা এ দেশে তাদের প্রতি অনুগত দল ও রাজনীতিবিদদের দিয়ে গত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এ মার্কেট কবজায় রাখা এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। যে সমস্ত রাজনৈতিক দল তাদের অনুগত ছিল না বা তারা অনুগত নয় বলে তাদের বিশ্বাস ছিল তাদের শিখণ্ডি সরকার কর্তৃক নির্যাতনের শিকার বানিয়েছে এবং এমনকি মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে বিচারের নাটক সাজিয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়েছে। তারা এ দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর শুধু বাজারই নিয়ন্ত্রণ করতো না বরং তাদের নির্ধারিত উচ্চ মূল্যে তা ক্রয় করতেও বাধ্য করতো।
অতীতে ভারত থেকে বাংলাদেশ কর্তৃক আমদানিকৃত লাখ লাখ টন পচা চাল ও পচাগম দুঃখজনকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাংলাদেশ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আবার কোন কোন সময় দেখা গিয়েছে যে বাংলাদেশে তার প্রধান খাদ্যশস্য চাল আমদানির জন্য ভারতের দারস্ত হয়েও তারা ওই চাল পায় নি, এ ধরনের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে কিন্তু ভারত বিকল্প উৎস থেকেও বাংলাদেশকে তা আমদানি করতে দেয় নি।
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আমদানি রপ্তানিতে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মধ্যে আছে পাট ও পাট জাত পণ্য বিশেষ করে জুট ইয়ার্ন, পরিবেশবান্ধব জিও টেক্সটাইল , বেল্ট ও ওয়ালেট, লেদার ও লেদার জাতীয় পণ্য, জুতা, পাদুকা, সামুদ্রিক মাছ বিশেষ করে হিমায়িত চিংড়ি, গলদা, বাগদা প্রভৃতি, ওষুধ সামগ্রী, সিরামিক পণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী ও হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, কটন টেক্সটাইল, পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, তৈরি পোশাক, চা প্রভৃতি অন্যদিকে পাকিস্তানের তৈরি টেক্সটাইল সামগ্রী পৃথিবী বিখ্যাত। বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে কটন টেক্সটাইলস, গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল বিশেষ করে কাঁচা তুলা, হেভি আনব্লিচ্ট কটন উবেন ফেব্রিক, রেডিমেট লেডিস ড্রেস, সেলাই ছাড়া স্যুট, ডেনিম এবং কৃত্রিম সুতা, খেজুর, ছোলা বুট, ভোজ্য তেল, দানা জাতীয় খাদ্যশস্য বিশেষ করে চাল, গম, কৃষি ও খাদ্য পণ্য, খনিজ পদার্থ নির্মাণ সামগ্রী, লবণ, সালফার, মার্বেল ও গ্রেনাইট পাথর, মেডিকেল ও চক্ষু চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, সার্জারি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিশেষ করে মসলাজাতীয় পণ্য যেমন পিঁয়াজ, রসুন, আদা , জিরা, তেজপাতা, হলুদ, মরিচ, গোলমরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, দারচিনি, মেথি, তিল, তিসি প্রভৃতির চাহিদাও বাংলাদেশে প্রচুর এবং এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারত থেকে এগুলো আমদানি করে আসছিল যদিও তার আমদানি অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ, ব্যবসায় সম্প্রদায় এবং স্ব স্ব দেশে নিয়োজিত তাদের কূটনৈতিকদের নিয়ে এ ব্যাপারে উভয় দেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সমঝোতা চুক্তি/ চুক্তিতে আসতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস। কৃষি ক্ষেত্রেও উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারেন। এতে উভয় দেশই উপকৃত হবে। আরেকটি সহযোগিতার খাত হচ্ছে চিকিৎসা খাত, এই খাতে বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানের সাফল্য অনেক বেশি। আগামী বারে দুটি বিষয় আলোচনার আশা রাখি। (চলবে)
