দেশে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ রেখে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। এ অধ্যাদেশে ছাদ, আঙিনা, পরিত্যক্ত জমি, জলাশয় ও চা বাগানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, সহজ শর্তে অর্থায়ন, নেট-মিটারিং সুবিধা এবং প্রকল্পের তদারকির বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার চুরি, ভাঙচুর, অবৈধ সংযোগ ও কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় গেজেট আকারে অধ্যাদেশটি প্রকাশ করে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি কোম্পানি এবং বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এ ছাড়া ভবন, পার্কিং লট, গ্যারেজ, বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনার ছাদ, পরিত্যক্ত জমি, জলাশয় ও চা বাগানে সৌরপ্যানেল স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এ অধ্যাদেশের আওতাভুক্ত হবে না।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে ওপেক্স (OPEX) মডেলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতিতে সার্ভিস প্রোভাইডার নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহার বা মূল্য নির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে। অন্যদিকে, যেসব গ্রাহকের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে, তাঁরা ক্যাপেক্স (CAPEX) মডেলে নিজেদের অর্থে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সহজীকৃত পদ্ধতিতে সার্ভিস প্রোভাইডারদের জেলাভিত্তিক তালিকা সংরক্ষণ করবে। গ্রাহকরা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অথবা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে তাঁদের পছন্দের সার্ভিস প্রোভাইডার নির্বাচন করতে পারবেন। বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত আদর্শ চুক্তিনমুনা অনুসরণ করা হবে।
চুক্তিতে স্থান ব্যবহারের অধিকার, যন্ত্রপাতির মান, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রস্তুতকারকের বাতিল যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা বা ‘টেক-ব্যাক স্কিম’, বিদ্যুতের মূল্যহার এবং নেট-মিটারিং সুবিধার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ক্রয়প্রক্রিয়ায়ও কিছু বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত পণ্য ও সেবা কেনা যাবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্রয়প্রক্রিয়ায় ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ইজিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তাদের ওয়েবসাইটে স্থাপিত সব বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ করবে। পাশাপাশি প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা সচল রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার নেট-মিটারিংসংক্রান্ত প্রণোদনামূলক কার্যক্রমও ঘোষণা করবে।
সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ ও নীতিগত সমন্বয় জোরদার করতে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে অর্থ, আইন ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ সচিবরা সদস্য হিসেবে থাকবেন।
জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। এ কমিটিতে পুলিশ সুপার, স্থানীয় প্রকৌশলী এবং বিদ্যুৎ সংস্থার জেলা পর্যায়ের প্রধানরা থাকবেন। কমিটি প্রতি তিন মাস অন্তর জাতীয় পলিসি কাউন্সিলের কাছে প্রতিবেদন দেবে। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করবে। এ কমিটি প্রতি মাসে জেলা কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি, চোরাই পণ্য কেনাবেচা কিংবা হেফাজতে রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। সৌরপ্যানেল বা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ ভাঙচুর কিংবা ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া অবৈধ সংযোগ স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের বাধা দেওয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে। অধ্যাদেশের অধীন অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে করা যাবে। ক্ষেত্রবিশেষে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এসব অপরাধের বিচার করা যাবে।
অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, এর অধীন সরল বিশ্বাসে কোনো কাজ করার কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সংশ্লিষ্ট সরকার, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা অথবা অন্য কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং প্রকল্পের মান ও পরিচালনা নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিধানগুলোর বাস্তবায়ন, প্রকল্প তদারকি এবং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর।
The post ছাদ, আঙিনা ও জলাশয়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি appeared first on ভোরের চেতনা.
