রংপুর অঞ্চলে বাড়ছে আলুর উৎপাদন। কিন্তু মৌসুমে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় প্রতিবছরই লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন এবং সংরক্ষণে সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। গত মৌসুমে উৎপাদিত আলুর বড় একটি অংশ এখনো হিমাগারে পড়ে আছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন মৌসুমের আলু চাষ, ফলে আবারও লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকেরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে রংপুর অঞ্চলে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে ২৮ লাখ ৫৪ হাজার ২০৩ টন এবং দিনাজপুর অঞ্চলে ৯১ হাজার ৭৩১ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ২২ হাজার ৪৮৪ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টাকায়। এর মধ্যে কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা হিমাগার ভাড়া দিতে হচ্ছে। ফলে আলু বিক্রির পর কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ৭ থেকে ৮ টাকা। অথচ হিমাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে ১৬ থেকে ১৮ টাকা। সে হিসাবে বর্তমান দরে আলু বিক্রি করলে কেজিপ্রতি লোকসান হচ্ছে প্রায় ৮ থেকে ১১ টাকা।
মৌসুমের শুরুতে দাম আরও কম থাকায় অনেক কৃষককে কেজিপ্রতি ৮ থেকে ৯ টাকা লোকসানে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। বিভাগের মোট উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে কেজিপ্রতি ১০ টাকা লোকসান হিসাব করলে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ১৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে এটি সম্ভাব্য হিসাব; প্রকৃত লোকসানের পরিমাণ কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও উৎপাদন খরচের ওপর নির্ভর করবে।
রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর এলাকার কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, “আগাম আলু চাষ শুরু হয়ে গেছে। এদিকে আমরা গত বছরের আলুই এখনো বিক্রি করতে পারিনি। ভালো দাম নেই। এখন আলু চাষ মানেই ক্ষতি।”
একই এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, গত তিন মৌসুম ধরে আলু চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। তাই এবার আর আলু চাষ না করে সরিষা, পেঁয়াজসহ ভালো দাম পাওয়া যায়—এমন সবজি চাষের পরিকল্পনা করছেন।
কৃষক রাজকুমার সরকারের মতে, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের লাভজনক ফসল চাষের প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ এ বিষয়ে সহায়তা করলে অনেক কৃষক আলুর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী হতেন। লাভজনক অনেক ফসলের চাষপদ্ধতি না জানায় তাঁরা সেদিকে যেতে পারছেন না।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর ধরে আলুতে লোকসানের অন্যতম কারণ চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি উৎপাদন। কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শুধু আলু নয়, কিছু জমিতে ভুট্টা, সবজি ও ধান চাষের মাধ্যমে ফসলের বৈচিত্র্য আনার কথা বলা হচ্ছে। এতে একটি ফসলে লোকসান হলে অন্য ফসল থেকে তা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে কৃষকদের মধ্যে আলু চাষের প্রতি একধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা। তাঁর মতে, লাভজনক ও বিকল্প ফসলের দিকে কৃষকদের আগ্রহী করা গেলে আলুতে লোকসানের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
